আশাবরী ঠাট । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের গাঠনিক ভিত্তি হলো ঠাট ব্যবস্থা। যে সাতটি স্বরকে কেন্দ্র করে অসংখ্য রাগের জন্ম, তাদের বিন্যাস ও স্বরবৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই প্রতিটি ঠাট নির্ধারিত হয়। এই ঠাটসমূহের মধ্যে আশাবরী ঠাট এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রেখেছে—কারণ এর রাগগুলো সাধারণত কারুণ, ভাবগম্ভীর ও গভীর অনুভূতিপ্রবণ। এই ঠাটের রাগে প্রকাশ পায় বিরহ, লোকায়ত আবেগ, দুঃখ-নিবেদন ও অন্তর্মুখী আর্তির মধুর রূপ।

আশাবরী ঠাট : হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক গভীর অনুভূতির রাগগোষ্ঠী

ঠাট কী ও আশাবরী ঠাটের অবস্থান

ঠাট অর্থ ধাঁচ বা গঠন। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রতিটি ঠাট হলো সাতটি স্বরের একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস, যা থেকে বিভিন্ন রাগের সৃষ্টি হয়। এই ধারণা প্রবর্তন করেন সংগীততাত্ত্বিক Vishnu Narayan Bhatkhande। তিনিই প্রথম রাগগুলোকে ১০টি প্রধান ঠাটে শ্রেণিবদ্ধ করেন।

এই দশটি ঠাটের একটি হলো আশাবরী ঠাট—যার স্বর বিন্যাস বিশেষভাবে কোমল (কোমল রে, গা, ধা ও নি) ব্যবহারের জন্য পরিচিত। এর ফলে এই ঠাটের রাগগুলোতে একটি বেদনাময়, করুণ ও মর্মস্পর্শী আবহ তৈরি হয়।

আশাবরী ঠাটের স্বরবিন্যাস

আশাবরী ঠাটে ব্যবহৃত হয় সাতটি স্বর:

  • সা
  • রে (কোমল)
  • গা (কোমল)
  • মা (শুদ্ধ)
  • পা
  • ধা (কোমল)
  • নি (কোমল)

অর্থাৎ:

সা রে(কো) গা(কো) মা পা ধা(কো) নি(কো)

এই স্বরবিন্যাসের ফলে এই ঠাটে সৃষ্টি হওয়া রাগে স্বাভাবিকভাবেই গম্ভীরতা ও বিষণ্ণতা প্রবেশ করে।

আশাবরী ঠাটের প্রধান রাগসমূহ

এই ঠাটের অধীন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাগ:

  • রাগ আশাবরী
  • রাগ জৌনপুরী
  • রাগ সিন্দুরা
  • রাগ দৌলতখানী
  • রাগ দেবসখী
  • রাগ কামোদী
  • রাগ গাণ্ডহারী
  • রাগ দরবারী আশাবরী
  • রাগ শুদ্ধ আশাবরী
  • রাগ দেবরাঞ্জনী

এই রাগগুলো মূলত করুণ, বিষাদ, ভক্তি ও অন্তর্লীনতামূলক ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।

সময় ও রস

হিন্দুস্থানি রাগসমূহ সময়ভিত্তিক গাওয়া হয়। আশাবরী ঠাটভুক্ত রাগগুলো সাধারণত গাওয়া হয়:

🕘 সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা

এই সময়ে পরিবেশন করলে রাগের রস (emotional flavour) সর্বাধিক ফুটে ওঠে।

রসের দিক থেকে আশাবরী ঠাটের রাগগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • করুণ রস
  • শৃঙ্গার রস (বিরহাত্মক)
  • শান্ত রস
  • ভক্তি রস

 

 

কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য

আশাবরী ঠাটের রাগসমূহ সাধারণত বিলম্বিত লয়ে প্রকাশ পায়। স্বরের চলন ধীর, সংযত এবং গভীর। গমক, মীড় ও কানস্বরের ব্যবহার এই রাগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঠাটের রাগের কয়েকটি সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য:

  • কোমল স্বরের প্রাধান্য
  • অবরোহণে অধিক প্রকাশ
  • গভীর আরোহ-অবরোহ পদ্ধতি
  • সংলগ্ন স্বরের মীড়প্রয়োগ
  • স্থায়ী ও অন্তরার ভাবগম্ভীরতা

 

 

নজরুল সংগীতে আশাবরী ঠাট

কাজী নজরুল ইসলাম আশাবরী ঠাটের রাগে অসংখ্য গান রচনা করেছেন। তিনি এই ঠাটের বিষণ্ণতা ও করুণ ভাবকে ইসলামী গান, শ্যামাসঙ্গীত ও প্রেমগীতিতে দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছেন।

নজরুলের গানে আশাবরী রাগের ব্যবহার একদিকে যেমন শাস্ত্রীয়তা বজায় রাখে, অন্যদিকে সাধারণ শ্রোতার হৃদয়েও পৌঁছে যায়।

আধুনিক সংগীতে প্রভাব

আজকের আধুনিক বাংলা ও হিন্দি গানেও আশাবরী ঠাটের ছাপ দেখা যায়। অনেক চলচ্চিত্রগীতে এই ঠাট থেকে অনুপ্রাণিত সুর ব্যবহার করা হয়েছে—বিশেষত করুণ, স্মৃতিময় বা বিরহাত্মক দৃশ্যে। এই ঠাট প্রমাণ করে—শাস্ত্রীয় সংগীত কেবল অতীতের বিষয় নয়; বরং আধুনিক সংগীতের প্রাণশক্তিও এখান থেকেই উৎসারিত।

হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

আশাবরী ঠাট শুধু একটি স্বরবিন্যাস নয়—এ এক আবেগের প্রকাশভঙ্গি। এই ঠাটের রাগে যে অন্তর্দহন, বিষণ্ণতা ও শান্তির মিশ্র সুরধারা রয়েছে, তা মানবমনের গভীরতম অনুভূতিকে স্পর্শ করে। যে শ্রোতা সংগীতে কেবল বিনোদন নয়, অনুভব খোঁজেন—আশাবরী ঠাট তাঁদের জন্য এক অনবদ্য আশ্রয়।