ইলাইয়ারাজার পুরোনো সুরে নতুন প্রজন্মের মুগ্ধতা

ভারতের কিংবদন্তি সুরকার ইলাইয়ারাজার সংগীত নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে জেনারেশন জেডের (জেন জি) শ্রোতাদের মনে। কয়েক দশক আগে তৈরি তাঁর গান ও যন্ত্রসংগীত এখন ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস এবং অনলাইন সংগীতভান্ডারের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে তরুণদের কাছে। সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সংগীত শোনার মাধ্যম, কিন্তু তাঁর সুরের আবেদন নতুন শ্রোতাদের কাছেও অটুট রয়েছে।

আগের প্রজন্মের কাছে নতুন গান আবিষ্কারের অন্যতম মাধ্যম ছিল রেডিও, ক্যাসেট ও চলচ্চিত্রের অ্যালবাম। পছন্দের শিল্পীর নতুন গান শোনার জন্য অপেক্ষা করতেন শ্রোতারা। এখন সেই অভিজ্ঞতা অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোনে প্লেলিস্ট শুনতে গিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখতে গিয়ে কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সুপারিশে হঠাৎ করেই ইলাইয়ারাজার কোনো গান খুঁজে পাচ্ছেন তরুণেরা।

এই আগ্রহের পেছনে কেবল পুরোনো দিনের স্মৃতি কাজ করছে না। নতুন প্রজন্মের অনেক শ্রোতার কাছেই তাঁর গান একেবারে নতুন আবিষ্কার। কোনো ভিডিওতে কয়েক সেকেন্ডের সুর শুনে তাঁরা মূল গানটি খুঁজছেন, পরে শুনছেন পুরো অ্যালবাম কিংবা একই সুরকারের অন্য সৃষ্টি। এভাবেই কয়েক দশক আগের সংগীত নতুন প্রজন্মের শ্রবণ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠছে।

ডিজিটাল মাধ্যম খুলে দিচ্ছে সংগীতের নতুন দরজা

সংগীত আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একসময় রেডিওর অনুষ্ঠান, ক্যাসেটের দোকান ও টেলিভিশনের সংগীতানুষ্ঠান শ্রোতাদের নতুন গানের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিত। বর্তমানে সেই জায়গার বড় অংশ নিয়েছে অনলাইন প্লেলিস্ট, স্ট্রিমিং সেবা এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক সুপারিশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পুরোনো গানের অংশ জনপ্রিয় হলে তা শ্রোতাদের মূল গানটি খুঁজে শুনতে উৎসাহিত করতে পারে। একটি সুরের প্রতি আগ্রহ থেকেই তাঁরা সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রের সংগীত কিংবা সুরকারের অন্য অ্যালবামের খোঁজ নিতে পারেন। ফলে একটি ছোট ভিডিও কখনো কখনো বিশাল সংগীতভান্ডার আবিষ্কারের সূচনা হয়ে উঠছে।

ইলাইয়ারাজার ইলয়া নিলা, ভালাইওসাই, মন্দ্রম ভান্ধা থেন্দ্রালুক্কু, পুভে সেম্পুভে, নিলাভে ভা এবং রাজা রাজা চোলান—এ ধরনের গান তামিল চলচ্চিত্রের সংগীত অন্বেষণ করতে গিয়ে নতুন শ্রোতাদের আকৃষ্ট করছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা ভাষাগত বাধাও অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। তামিল ভাষা না জানলেও শ্রোতারা একটি গানের সুর, বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাস এবং আবেগপূর্ণ পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন। বিশেষ কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত সংগীত তাঁদের মনে দাগ কাটলে সেই সুরের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।

নতুন চলচ্চিত্রে ফিরে আসছে পুরোনো গান

ইলাইয়ারাজার সংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চলচ্চিত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া মালয়ালম চলচ্চিত্র মাঞ্জুমেল বয়েজ-এ ব্যবহৃত হয়েছিল তাঁর জনপ্রিয় গান কানমানি আনবোদু। গানটি মূলত ১৯৯১ সালের তামিল চলচ্চিত্র গুনা-এর জন্য তৈরি হয়েছিল।

নতুন চলচ্চিত্রের একটি আবেগঘন মুহূর্তে গানটির ব্যবহার দর্শকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করে। যাঁরা মূল চলচ্চিত্রটি দেখেননি, তাঁরাও গানটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। পরে তাঁরা মূল গানটি শোনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হতে পারেন।

২০২৬ সালে নির্মাতা কার্তিক সুব্বারাজের ডরোথি চলচ্চিত্রে ইলাইয়ারাজার তিনটি সংগীত ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ তাঁর পুরোনো সৃষ্টিকে সমসাময়িক চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করছে।

একটি গান যে চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটির বাইরেও তার আবেদন টিকে থাকতে পারে। নতুন কোনো দৃশ্যে ব্যবহৃত হলে পুরোনো সুর ভিন্ন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ ও আবেগ নিয়ে হাজির হয়। চলচ্চিত্রের এই ক্ষমতাই পুরোনো সংগীতকে নতুন করে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ডিজিটাল যুগে সংগীতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কপিরাইট ও মালিকানার প্রশ্নও সামনে এসেছে। নিজের সৃষ্টির ওপর অধিকার নিয়ে ইলাইয়ারাজা বিভিন্ন সময়ে অবস্থান জানিয়েছেন এবং অনুমতি ছাড়া সংগীত ব্যবহারের অভিযোগে আইনি নোটিশ দিয়েছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সময়ে শিল্পীর স্বত্ব, অনুমতি এবং সংগীত ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলার গুরুত্বও বাড়ছে।

সুরের বৈচিত্র্যেই আলাদা ইলাইয়ারাজা

ইলাইয়ারাজার সংগীতের আবেদন শুধু মনে থাকার মতো সুরে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সংগীতায়োজনে বেস গিটার, গিটার, স্ট্রিংস ও বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয় বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। মনোযোগ দিয়ে শুনলে একই গানের মধ্যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের স্বতন্ত্র ভূমিকা এবং সুরের সূক্ষ্ম পরিবর্তন উপলব্ধি করা যায়।

হেডফোন ও উন্নত মানের ডিজিটাল রেকর্ডিংয়ের সহজলভ্যতা তরুণদের এই দিকগুলো আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার সুযোগ করে দিয়েছে। শুরুতে কোনো গানের মূল সুরে আকৃষ্ট হলেও পরে তাঁরা এর বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, ছন্দের পরিবর্তন এবং সংগীতায়োজনের জটিলতার প্রতিও আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।

বিশেষ করে চলচ্চিত্রের আবহসংগীতে ইলাইয়ারাজার দক্ষতা তাঁর কাজকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে। আবহসংগীত শুধু সংলাপের পেছনে বাজতে থাকা সুর নয়; এটি দৃশ্যের আবেগকে গভীর করতে, চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করতে কিংবা কোনো মুহূর্তের গুরুত্ব বাড়াতে পারে।

নিঃসঙ্গতা, অপেক্ষা, শোক, ভালোবাসা ও আশার মতো অনুভূতি প্রকাশে সংগীতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো সঠিক সময়ে সংগীতের অনুপস্থিতিও দৃশ্যের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়।

চলচ্চিত্র পরিচালক জন মাহেন্দ্রন ইলাইয়ারাজার দ্রুত চলচ্চিত্রের পরিস্থিতি বুঝে নেওয়ার এবং কোন মুহূর্তে সংগীত দৃশ্যের আবেগ বাড়াতে পারে, তা উপলব্ধি করার দক্ষতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে, ইলাইয়ারাজার আবহসংগীত শুধু পর্দার দৃশ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না; বরং দৃশ্যের ভেতরে থাকা অনুভূতির আরেকটি স্তরও প্রকাশ করতে পারে।

সংগীত কিউরেটর ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব সুবাশ্রী থানিকাচালামও তাঁর সুরের স্মরণীয় অংশগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আকর্ষণীয় সুরের ছোট অংশ স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওতে সহজেই ব্যবহার করা যায়। তবে এসব অংশের আবেদন শ্রোতাদের পুরো গান শোনার আগ্রহ তৈরি করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যন্ত্রসংগীতের আবেদন

ইলাইয়ারাজার হাউ টু নেম ইট? এবং নাথিং বাট উইন্ড অ্যালবাম দুটি তাঁর যন্ত্রসংগীতের জগতের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব সংগীত উপভোগ করতে তামিল ভাষা জানা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি নয়। সুর, ছন্দ ও বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাসের মধ্য দিয়েই শ্রোতারা সংগীতের আবেগ উপলব্ধি করতে পারেন।

স্ট্রিমিংয়ের যুগে অনেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াই সংগীত শুনছেন। কোনো যন্ত্রসংগীতের ছোট অংশ দিয়ে শুরু করে তাঁরা পুরো অ্যালবাম শোনার আগ্রহ পেতে পারেন। এরপর সুরকারের অন্য কাজের প্রতিও কৌতূহল তৈরি হতে পারে।

ইলাইয়ারাজার সংগীতজীবনে নতুন ধারায় কাজ করার আগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে লন্ডনে রয়্যাল ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রার পরিবেশনায় তাঁর ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল সিম্ফনি ভ্যালিয়্যান্ট প্রথমবারের মতো মঞ্চে পরিবেশিত হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও ভিন্ন সংগীতধারায় তাঁর সম্পৃক্ততা সৃজনশীল অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।

প্রজন্ম বদলেছে, টিকে আছে সুরের আবেদন

ইলাইয়ারাজার সংগীতের সঙ্গে শ্রোতাদের পরিচিত হওয়ার মাধ্যম সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে। আশির দশকে তাঁর গান ছড়িয়ে পড়েছিল চলচ্চিত্র ও রেডিওর মাধ্যমে। ক্যাসেটের যুগে সেই সুর পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে, বাসে কিংবা পাড়া-মহল্লার আড্ডায়। পরে সিডি, টেলিভিশন সম্প্রচার ও ডিজিটাল আর্কাইভ নতুন প্রজন্মকে তাঁর সংগীতের সঙ্গে পরিচিত করেছে।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্লেলিস্ট, হেডফোন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এবং অনলাইন সুপারিশ সংগীত আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে পুরোনো গান শোনার অভিজ্ঞতাও বদলে গেছে। একসময় যে গান নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র কিংবা কোনো সময়ের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন সেটি চলচ্চিত্রের বাইরেও স্বতন্ত্র সংগীত হিসেবে শ্রোতার কাছে পৌঁছাচ্ছে।

এই নতুন আগ্রহ দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি পুরোনো সৃষ্টিকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে পারে। তবে শুধু প্রযুক্তির উপস্থিতিই কোনো গানকে দীর্ঘস্থায়ী করে না। সুরের গভীরতা, সংগীতায়োজনের স্বাতন্ত্র্য এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষমতাই শ্রোতাকে বারবার ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।

ইলাইয়ারাজার ক্ষেত্রে এসব বৈশিষ্ট্য নতুন প্রজন্মের আগ্রহের ভিত্তি তৈরি করছে। তাঁর গান এখন আর শুধু আগের দশকগুলোর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত নয়; তরুণেরা নিজেদের পছন্দ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও এসব সুর আবিষ্কার করছেন।

স্ট্রিমিং সেবা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভবিষ্যতেও সংগীত শোনার ধরন বদলে দেবে। তবে ইলাইয়ারাজার সংগীতের নতুন শ্রোতা তৈরি হওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ভালো সুরের আবেদন কোনো নির্দিষ্ট প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকাশের সময় পেরিয়ে গেলেও সৃষ্টির আবেগ ও সৌন্দর্য অটুট থাকলে তা নতুন শ্রোতার মনেও জায়গা করে নিতে পারে।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।