ওস্তাদ সুধীন দাশ: বাংলা গানের শুদ্ধতার বাতিঘর ও চিরঞ্জীব সঙ্গীতসাধক

বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের ইতিহাসে সুধীন দাশ একটি নাম নয়, বরং একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, গবেষক, সুরকার, স্বরলিপিকার ও শিক্ষক সঙ্গীতের প্রতিটি শাখায় রেখে গেছেন তাঁর কালজয়ী সাক্ষর। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল সুরের একনিষ্ঠ সাধনা। আজ ২৭ জুন এই মহান সঙ্গীতসাধকের প্রয়াণদিবস। ২০১৭ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম আজও বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বেঁচে আছে।

১৯৩০ সালের ৩০ এপ্রিল কুমিল্লার এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুধীন দাশ। পিতা নিশিকান্ত দাশ এবং মাতা হেমপ্রভা দেবীর এই সন্তান শৈশবেই সুরের জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয়েছিল বড় ভাই সুরেন দাশের হাত ধরে। ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই পরবর্তীতে তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রাতিষ্ঠানিক ও গভীর তালিম গ্রহণ করেন এবং সঙ্গীতকেই নিজের জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে বেছে নেন।

১৯৪৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রেডিওতে অডিশন দেওয়ার মাধ্যমে সুধীন দাশের পেশাদার শিল্পীজীবনের সূচনা ঘটে। দেশভাগের সেই উত্তাল সময়েও তিনি সুরের সাধনা থেকে বিচ্যুত হননি। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের (বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন) সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে সঙ্গীত পরিচালনা, নতুন প্রতিভা তৈরি এবং সঙ্গীত গবেষণায় তিনি নিয়োজিত করেন নিজেকে।

ওস্তাদ সুধীন দাশের সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী অবদান হলো নজরুলগীতির আদি সুর ও বাণী উদ্ধার এবং তার স্বরলিপি তৈরি করা। এক সময় কাজী নজরুল ইসলামের গানগুলোর মূল সুর বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই ক্রান্তিকালে সুধীন দাশ মূল গ্রামোফোন রেকর্ডের বাণী ও সুর অনুসরণ করে নজরুলসংগীতকে আদি ও শুদ্ধ রূপে স্বরলিপিবদ্ধ করার এক মহৎ এবং কঠিন উদ্যোগ নেন। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে ১৬ খণ্ড এবং নজরুল একাডেমি থেকে ৫ খণ্ডসহ মোট ২১ খণ্ডের নজরুলগীতির স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর এই অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আজকের প্রজন্ম কবি নজরুলের গানকে তার আদি ও অকৃত্রিম সুরে গাইতে পারছে।

নজরুলগীতির পাশাপাশি লালনসংগীতের প্রসারেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তিনিই প্রথম লালনগীতির শুদ্ধ স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বাউল সম্রাট লালন শাহের মুখে মুখে প্রচলিত গানগুলোকে খাতার পাতায় স্বরলিপির ফ্রেমে বেঁধে তিনি লালনগীতিকে বিশ্ব দরবারে আরও গ্রহণযোগ্য ও শুদ্ধ রূপে উপস্থাপনের পথ সুগম করেন।

তিনি কেবল একজন গবেষক বা সুরকারই ছিলেন না, ছিলেন এক অসাধারণ শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের গ্রেডেশন বোর্ডের প্রধান বিচারক এবং বাংলা স্বরলিপি প্রমাণীকরণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। ১৯৭০ সালে ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কে প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান কালচারাল একাডেমির (যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কালচারাল একাডেমি নামে পরিচিত হয়) অধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁর পরম স্নেহে ও শাসনে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী আজ দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত।

সঙ্গীতের এই বিশাল সমুদ্রে অবদানের জন্য ওস্তাদ সুধীন দাশ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৮৮ সালে পাওয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’। এছাড়াও তিনি চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের নানা গুণীজন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মারকে ভূষিত হন।

বাংলা গানের শুদ্ধতা রক্ষা ও সুরের এই মহীরুহের অভাব আজ প্রতিটি পদে পদে অনুভূত হয়। তাঁর প্রয়াণদিবসে আমাদের একটাই প্রার্থনা—তাঁর কর্ম, আদর্শ ও সৃষ্টিশীল সাধনা আগামী দিনের তরুণ সঙ্গীতশিল্পীদের পথ দেখাক। বাংলা সঙ্গীতের এই অমর নক্ষত্রের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।