বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কিছু নাম আছে, যেগুলো উচ্চারণ করলেই গর্ব, আবেগ ও ঐতিহ্যের গভীর অনুরণন শোনা যায়। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লাইল তেমনই এক অনন্য নাম। কয়েক দশকজুড়ে বিস্তৃত তাঁর সংগীতজীবন, সাধনার স্বতন্ত্র ধারা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ব্যক্তিত্বের দীপ্তিতে তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পী নন—বরং বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় রুনা লাইলের জীবন ও শিল্পীসত্তার নানা অজানা দিক তুলে ধরেন তাঁর স্বামী, প্রখ্যাত অভিনেতা আলমগীর। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ গর্ব করে বলতে পারে—আমাদের একজন রুনা লাইল আছেন।” আলমগীরের মতে, একজন শিল্পীর জীবনে মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানই সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে তিনি স্মরণ করেন বহু বছর আগের একটি আলোচিত ঘটনা, যখন ভারতের একটি পত্রিকায় ব্যঙ্গাত্মক অথচ প্রশংসাসূচক শিরোনামে লেখা হয়েছিল—‘রুনা লাইলাকে আমাদের দিন, আমরা আপনাদের ফারাক্কার পানি দিয়ে দেব।’ আলমগীরের ভাষায়, এই মন্তব্য কেবল জনপ্রিয়তার নয়, বরং রুনা লাইলের কণ্ঠ ও শিল্পীসত্তার সীমাহীন গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
অনুষ্ঠানে উঠে আসে তাঁর সংগীতচর্চার ব্যতিক্রমী পদ্ধতির কথাও। আলমগীর জানান, রুনা লাইলকে তিনি কখনো দীর্ঘ সময় ধরে তানপুরা হাতে রেওয়াজ করতে বা যন্ত্রনির্ভর সাধনায় মগ্ন হতে দেখেননি। বরং দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই তাঁর রেওয়াজ—হাঁটতে হাঁটতে, ঘরের কাজ করতে করতে, কাপড় ভাঁজের সময় কিংবা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তেও কণ্ঠসাধনা চলে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রুনা লাইল একবার হেসে বলেছিলেন, “আমার দরকার কণ্ঠকে ঠিক জায়গায় রাখা। এই তানগুলোই আমার রেওয়াজ। জীবনে এত উস্তাদের কাছে শিখেছি যে, এখন সুর আমার কানে বাস করে।” এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস ও দীর্ঘ সাধনার গভীরতা।
অনুষ্ঠানে রুনা লাইলও স্বামীর কিছু অভ্যাস নিয়ে মজার রসিকতা করেন। তিনি বলেন, আলমগীর নিজের চুল নিয়ে ভীষণ সচেতন। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝেও কিংবা লিফটে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁকে চুল ঠিক করতে দেখা যায়। এই ছোট ছোট রসিকতা তাঁদের দাম্পত্য জীবনের আন্তরিকতা ও হাস্যরসের আবহকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
রুনা লাইলের পেশাদারিত্বের আরেকটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত তাঁর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। নব্বইয়ের দশকে টানা তিন দিনে প্রতিদিন ১০টি করে মোট ৩০টি গান রেকর্ড করে তিনি এই বিশ্বরেকর্ড গড়েন। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে একটির পর একটি গান নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা তাঁর কণ্ঠের সক্ষমতা, শারীরিক সহনশীলতা ও শৃঙ্খলার অনন্য প্রমাণ।
১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া রুনা লাইলের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তৎকালীন পাকিস্তানে। সরকারি কর্মকর্তা বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ এমদাদ আলীর কর্মস্থলের কারণে পরিবার নিয়ে তিনি রাজশাহী থেকে লাহোরে বসবাস করেন। সেখানেই ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খান, আবদুল কাদের পিয়ারাং এবং পণ্ডিত গুলাম কাদেরের মতো খ্যাতিমান শিক্ষকদের কাছে সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক তালিম নেন। ১৯৬৫ সালে ‘জুগনু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় এক হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেন। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এসে তিনি নিজের শিকড় ও আত্মপরিচয় নতুন করে আবিষ্কার করেন। বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের সংগীতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান।
রুনা লাইলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১৭ নভেম্বর ১৯৫২, সিলেট |
| সংগীতজীবন শুরু | ১৯৬৫ সাল |
| রেকর্ডকৃত গান | প্রায় ১,০০০+ |
| গাওয়া ভাষা | ২০টির বেশি |
| জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার | ৮ বার |
| সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান | স্বাধীনতা পুরস্কার |
| আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি | গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড |
বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে রুনা লাইল এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর কণ্ঠে মিশে আছে সময়ের সাক্ষ্য, সাধনায় আছে শৃঙ্খলা ও আত্মনিবেদন, আর ব্যক্তিত্বে আছে সহজ সৌন্দর্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তিনি অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে থাকবেন।
