হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল সৌন্দর্য নিহিত আছে রাগের বিশুদ্ধতা, ভাবের গভীরতা ও তালের শৃঙ্খলার মধ্যে। এই তিন উপাদানের সার্থক মিলন ঘটে বান্দিশ-এর মাধ্যমে। কণ্ঠসংগীতে যেমন বান্দিশ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, তেমনি বাদ্যযন্ত্রে তার রূপান্তরিত রূপ হল বান্দিশ-গাত। উভয় ক্ষেত্রেই বান্দিশ কেবল একটি স্থির রচনা নয়—এটি রাগের চরিত্র প্রকাশের মূল অবলম্বন।
Table of Contents
গীত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে “বান্দিশ” ও বাদ্যযন্ত্রে “বান্দিশ-গাত”
বান্দিশ কী?
গীতশাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বান্দিশ হল একটি নির্দিষ্ট রাগ ও তালে নিবদ্ধ সুর-রচনা, যার মাধ্যমে শিল্পী রাগের রূপ উন্মোচিত করেন। এতে সাধারণত দুটি প্রধান অংশ থাকে—
- স্থায়ী — মূল স্বরের পরিসর স্থাপন করে।
- অন্তরা — তার ভিতর বর্ধিত পরিসরে রাগের বিস্তার ঘটে।
কখনও কখনও ধ্রুপদ ধারায় সঞ্চারী ও আবোগ অংশও দেখা যায়। বান্দিশের ভাষা সাধারণত ব্রজ, হিন্দি, ফারসি বা অবধি হতে পারে এবং বিষয়বস্তুতে থাকে প্রেম, ভক্তি, ঋতু, প্রকৃতি বা দর্শন।
বান্দিশের ঐতিহাসিক বিকাশ
প্রাচীন ধ্রুপদ ধারায় বান্দিশের প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। রাজদরবারে গায়নশৈলীর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ধামার ও খেয়ালের বান্দিশ পরিণত আকার ধারণ করে। মুঘল যুগে শাস্ত্রীয় সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু বান্দিশ রচিত হয় এবং সেগুলি ঘরানাভিত্তিক ঐতিহ্যে সংরক্ষিত থাকে।
ঘরানা ও বান্দিশ
হিন্দুস্থানি সঙ্গীতে প্রতিটি ঘরানার একটি নিজস্ব বান্দিশ-ভাণ্ডার রয়েছে। যেমন—
- গ্বালিয়র ঘরানা — সরল ও পরিমিত বান্দিশ।
- কিরানা ঘরানা — স্বরের বিশুদ্ধতা ও দীর্ঘ মীন্ডভিত্তিক বান্দিশ।
- আগরা ঘরানা — শক্তিশালী লয় ও ধ্রুপদী প্রভাব।
- পটিয়ালা ঘরানা — দ্রুত তান ও অলংকারপ্রচুর বান্দিশ।
প্রতিটি ঘরানার বান্দিশেই রাগ পরিবেশনের অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
বাদ্যযন্ত্রে “বান্দিশ-গাত”
যখন কোনও বান্দিশ কণ্ঠসংগীত থেকে বাদ্যযন্ত্রের ভাষায় রূপান্তরিত হয়, তখন তাকে বলা হয় গাত বা বান্দিশ-গাত। যেমন—সিতার, সরোদ, সারেঙ্গি বা বাঁশিতে গাওয়া বান্দিশের সুর বাদ্যরূপে পরিবেশিত হয়।
বাদ্যগাতে থাকে—
- স্থায়ী-গাত
- অন্তরা-গাত
এরপর আলাপ, জোর, ঝালা বা তানের মাধ্যমে রাগের বিস্তার ঘটে।
তালের ভূমিকা
বান্দিশ-গাতের সৌন্দর্য বহুলাংশে নির্ভর করে তালের উপর। তীনতাল, একতাল, ঝাপতাল, রূপক, ধামার প্রভৃতি তালে বান্দিশ পরিবেশিত হয়। শিল্পী তালের মধ্যে থেকেই লয়ের খেলা করেন—যাকে বলা হয় লাইকারী।
রাগরূপ গঠনে বান্দিশের ভূমিকা
বান্দিশ ছাড়া রাগ এক প্রকার বিমূর্ত ধারণা। বান্দিশ সেই ধারণাকে মূর্ত রূপ দেয়।
এটি—
- রাগের আরোহ-অবরোহ প্রতিষ্ঠা করে,
- ভাড়ী-সমবাদী স্বর তুলে ধরে,
- রাগের সময় ও ভাব নির্দেশ করে।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বান্দিশ
শব্দিত শিক্ষায় বান্দিশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থী প্রথমে বান্দিশ শিখে রাগের কাঠামো বোঝে। এরপর ধীরে ধীরে—
- বোল তান
- সারগম
- লয়কারি
আয়ত্ত করে।
আধুনিক যুগে বান্দিশ ও গাত
আজও গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বান্দিশ মুখে মুখে শেখানো হয়। তবে আধুনিক যুগে রেকর্ডিং ও নোটেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকলন হচ্ছে।

বান্দিশ ও বান্দিশ-গাত হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত্তি-স্তম্ভ। কণ্ঠ ও বাদ্য—উভয় ধারাতেই এটি শিল্পের প্রাণ। রাগের আত্মা যেমন অবিনশ্বর, বান্দিশ তার ভাষা। এ কারণে বলা যায়, বান্দিশ ছাড়া হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের পূর্ণতা অসম্ভব।
