ঢাকায় ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের দুই প্রাচীন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচী শিলপীগোষ্ঠী-এর অফিসে আগুন লাগানো ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই হামলা দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ইসলামিক ও বাংলা পরিচয় সংক্রান্ত উত্তেজনাকে পুনরায় প্রকাশ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী এই হামলার পেছনে, যাদের মধ্যে এক নেতা বলেছিলেন যে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে “নির্মূল” করা উচিত। হামলার পরও উভয় প্রতিষ্ঠান দৃঢ় অবস্থান নেয় এবং তাদের কার্যক্রম পুনরায় চালু করে জনসাধারণের সহায়তা ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বানকে সামনে রেখে।
বাংলা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম দেশের সাংস্কৃতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঠাকুর নোবেল বিজয়ী এবং জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা, আর নজরুল বিদ্রোহী কবিতার জন্য “জাতীয় কবি” হিসেবে পরিচিত। হামলার পর তাদের ছবিগুলোও ভাঙচুরের শিকার হয়, যা দেশের সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শোক এবং ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে ছায়ানট ও উদীচী’র কার্যক্রম স্বাধীনতার আগে থেকে চলছে। তারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে উদীচীর প্রায় ১৫,০০০ সদস্য রয়েছে, আর ছায়ানট ঢাকা শহরে ৪,০০০ শিক্ষার্থী নিয়ে সঙ্গীত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অতীতেও উভয় প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:
| প্রতিষ্ঠান | হামলার বছর | হামলার ধরন | নিহত/আহত |
|---|---|---|---|
| ছায়ানট | ২০০১ | বোমা | ১০ নিহত, দশাধিক আহত |
| উদীচী | ১৯৯৯ | বোমা | ১০ নিহত |
| উদীচী | ২০০৫ | বাইরের আক্রমণ | ৮ নিহত |
ডা. সারওয়ার আলী, ছায়ানটের সভাপতি, বলেন, “বাংলা গানকে ধর্মের সঙ্গে অসমঞ্জস্য মনে করা হয়, তাই আমাদের লক্ষ্য করা হয়েছে।” উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে উল্লেখ করেছেন, “এই হামলা দেশের সাংস্কৃতিক ও শিল্পী সম্প্রদায়কে ভীত করার প্রচেষ্টা। অনেক শিল্পী এখন ঘরে অবস্থান করছে, যা দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।”
তারপরও উভয় প্রতিষ্ঠান ভীত হয়নি। হামলার পরদিন উদীচীর কর্মীরা অফিসের বাইরে সংগীত পরিবেশন করে প্রতিবাদ শুরু করে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছে। দে বলেন, “আমাদের পেছনে দেওয়াল আছে, তাই আমাদের একমাত্র পথ হলো এগিয়ে যাওয়া।”
হামলার ফলে প্রায় ২৪ মিলিয়ন টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং বহু সঙ্গীত যন্ত্র, বই ও ফার্নিচার ধ্বংস হয়েছে। তবে সামগ্রিক ক্ষতি শুধু অর্থের নয়, শিল্পী সম্প্রদায়ের মনোবল ও সাংস্কৃতিক চেতনারও। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা রক্ষার জন্য সংগীতই এখন প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার।