সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২২, ২:১ পিএম
গ্রামবাংলার চিরায়ত বাউল সুর ও বিচ্ছেদ গীতির এক অনন্য উদাহরণ হলো ‘তোরা বাতাস কর’ গানটি। লোকজ সুরের এই গানটি বিভিন্ন বাউল শিল্পীর কণ্ঠে যুগে যুগে গীত হলেও, তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) শিল্পী জান্নাত জাহানের কণ্ঠে এটি সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রা ও গভীরতা লাভ করেছে। সমাজের অবহেলা আর বঞ্চনাকে পেছনে ফেলে, কেবল আপন প্রতিভার জোরে মাথা উঁচু করে বাঁচার এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পের সাথে জড়িয়ে আছে এই গানের সুর।
Table of Contents
| গানের নাম | তোরা বাতাস কর |
| শিল্পী | জান্নাত জাহান (ও অন্যান্য বাউল শিল্পীগণ) |
| গানের ধরন | বাউল / বিচ্ছেদ গীতি |
| গীতিকার ও সুরকার | সংগৃহীত লোকজ সুর |
| বিশেষ পরিবেশনা | জান্নাত গাইছে (একক সঙ্গীত সন্ধ্যা) |
এই গানটির সাথে জড়িয়ে আছে শিল্পী জান্নাত জাহানের এক অদম্য সংগ্রামের গল্প। সমাজের আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো সম্মান নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখতেন জান্নাত। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া হওয়ার কারণে সমাজে সহজে জায়গা না পেলেও, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি বা চাঁদাবাজি করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। গানের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। তাঁর এই প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সংস্থা ‘রি-থিংক’ যৌথভাবে তাঁকে দীর্ঘ ছয় মাসের সঙ্গীত প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
প্রশিক্ষণ শেষে রাজধানীর গ্রিন রোডের ‘বিন্দুধারী’তে ‘জান্নাত গাইছে’ শিরোনামে তাঁর জীবনের প্রথম একক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে তিনি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও আধুনিক গানের পাশাপাশি ‘তোরা বাতাস কর’ গানটি গেয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। রি-থিংকের পরিচালক লুলু-আল-মারজানের তত্ত্বাবধানে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সাংস্কৃতিক বিকাশের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তারই এক সফল ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন শিল্পী জান্নাত জাহান।
তোরা বাতাস কর বাতাস কর বাতাস কর
সখি মাথায় পানি ঢাল তোরা।
যা করবার তা কইরা গেছে
আমার বন্ধু মন চোরা।
বন্ধুর মনে এই কিরে ছিল
সুখের ঘরে দুখের প্রদীপ জ্বালাইয়া গেল।
ওরে লাগবে না লাগবে না লাগবে না রে
ভাঙ্গা মনে জোড়া লাগবে না।
যারে ভালবাসিলাম
আসলেই তো সে আমারে ভালবাসে নাই।
তোরা দেখে যা দেখে দেখে যা রে।
Tora batash kor batash kor batash kor
Sokhi mathay pani dhal tora.
Ja korbar ta koira geche
Amar bondhu mon chora.
Bondhur mone ei kire chilo
Sukher ghore dukher prodip jwalaiya gelo.
Ore lagbe na lagbe na lagbe na re
Vanga mone jora lagbe na.
Jare valobashilam
Asholei to se amare valobashe nai.
Tora dekhe ja dekhe dekhe ja re.
গানটির মূল ভাব আবর্তিত হয়েছে গভীর প্রেম এবং চরম বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সৃষ্ট তীব্র মানসিক যন্ত্রণাকে কেন্দ্র করে। প্রিয় মানুষ যখন মন চুরি করে চরম আঘাত দিয়ে চলে যায়, তখন বিরহীর মনে যে কাল্পনিক আগুন জ্বলে ওঠে, তা নেভানোর জন্যই সে তার সখিদের কাছে বাতাস করার এবং মাথায় পানি ঢালার আকুল আবেদন জানায়। সুখের ঘরে দুঃখের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়ার এই রূপকটি গ্রামবাংলার মানুষের সহজ-সরল প্রেমের এক করুণ পরিণতিকে ফুটিয়ে তোলে।
গানের শব্দচয়ন অত্যন্ত সাধারণ এবং মাটির কাছাকাছি। ‘কইরা’, ‘জ্বালাইয়া’ বা ‘আমারে’-এর মতো খাঁটি আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার গানটিকে অনেক বেশি বাস্তব ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে। বাউল সুরের উন্মুক্ত ও উচ্চগ্রামের গায়কীর কারণে বিরহের এই আর্তি শ্রোতার অন্তরে সরাসরি আঘাত করে। ভাঙ্গা মনে যে আর কখনো জোড়া লাগে না, এই চরম সত্যটি গানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।
এই গানের বিশেষত্ব হলো এর পরিবেশনার প্রেক্ষাপট। শিল্পী জান্নাত যখন এই গানটি পরিবেশন করেন, তখন গানের বিরহের সাথে তাঁর নিজস্ব জীবনের বঞ্চনা, সমাজের বিশ্বাসঘাতকতা এবং একাকীত্বের এক অদৃশ্য মেলবন্ধন তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে গানটি কেবল আর একটি প্রেমের বিচ্ছেদ গীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রান্তিক মানুষের হৃদয়ের এক গভীর আর্তনাদে পরিণত হয়, যা শ্রোতার মনকে আর্দ্র করে তোলে।
এই নিবন্ধের তথ্যসমূহ সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং উন্নয়ন সংস্থা ‘রি-থিংক’-এর তৃতীয় লিঙ্গের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিবেদন, ‘সুন্দর বাজুক’ ও ‘জান্নাত গাইছে’ সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রামাণ্য নথিপত্র এবং প্রচলিত বাউল লোকগানের আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য