পউষ এলো গো – কাজী নজরুল ইসলাম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রকৃতি পর্যায়ের এক অসাধারণ ও বিষাদময় ঋতুসংগীত “পউষ এলো গো”। কবিতা হিসেবে এটি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দোলন-চাঁপা’-য় সংকলিত হয় এবং পরবর্তীতে সুরারোপের পর ‘নজরুল গীতিকা’-য় অন্তর্ভুক্ত হয়। শীত ঋতুর প্রথম মাস পৌষের আগমনকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এই গানটি চিরাচরিত উৎসবের আনন্দবার্তা নয়, বরং প্রকৃতি ও মানবজীবনের এক সকরুণ বিদায়গাথা। কুয়াশাচ্ছন্ন নিস্তব্ধতা, ঝরা পাতার দীর্ঘশ্বাস এবং কালের আয়ুক্ষয়ের গভীর দার্শনিক অনুভূতি গানটিকে বাংলা ঋতুভিত্তিক গানের জগতে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামপউষ এলো গো (গ্রন্থভুক্ত শিরোনাম: ‘পউষ’)
গীতিকার ও সুরকারকাজী নজরুল ইসলাম
পর্যায় ও বিষয়প্রকৃতি পর্যায় (শীত ও বিষাদ)
সুরশৈলী / অঙ্গবাউল
তাললোফা
প্রথম প্রকাশপ্রবাসী পত্রিকা (মাঘ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ / জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ১৯২৩)
রচনাস্থান ও প্রেক্ষাপটপ্রেসিডেন্সি জেল, কলকাতা (রাজনৈতিক বন্দিদশার সময়কাল)
গ্রন্থ সংকলনদোলন-চাঁপা (আশ্বিন ১৩৩০), নজরুল গীতিকা (ভাদ্র ১৩৩৭), নজরুল রচনাবলী

গানের লিরিক (বাংলা)

পউষ    এলো গো!
পউষ এলো অশ্রু-পাথার হিম পারাবার পারায়ে
ঐ যে এলো গো-
কুজঝটিকার ঘোম্‌টা-পরা দিগন্তরে দাঁড়ায়ে॥
সে এলো আর পাতায় পাতায় হায়
বিদায়-ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়,
অস্ত-বধূ (আ-হা) মলিন চোখে চায়
পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যা-তারায় হারায়ে॥
পউষ এলো গো-
এক বছরের শ্রান্তি পথের, কালের আয়ু-ক্ষয়,
পাকা ধানের বিদায়-ঋতু, নতুন আসার ভয়।
পউষ এলো গো! পউষ এলো-
শুক্‌নো নিশাস্‌, কাঁদন-ভারাতুর
বিদায়-ক্ষণের (আ-হা) ভাঙা গলার সুর-
ওঠে পথিক! যাবে অনেক দূর
কালো চোখের করুণ চাওয়া ছাড়ায়ে॥

 

Gaaner Lyric (Romanized)

Poush elo go!
Poush elo oshru-pathar him parabar paraye
Oi je elo go—
Kujjhôtikar ghomta-pora digontore daraye॥
Se elo ar patay patay hay
Biday-byatha jay go kende jay,
Osto-bodhu (a-ha) molin chokhe chay
Poth-chawa dip shondhya-taray haraye॥
Poush elo go—
Ek bochhorer shranti pother, kaler ayu-khoy,
Paka dhaner biday-ritu, notun ashar bhoy।
Poush elo go! Poush elo—
Shukno nishash, kandon-bharatur
Biday-khoner (a-ha) bhanga golaar sur—
Othe pothik! Jabe onek dur
Kalo chokher korun chawa charaye॥

গানের মূল ভাব

“পউষ এলো গো” গানটিতে শীতের আগমন ঘটেছে বিষাদের রূপ ধরে। বাংলা সাহিত্যে বসন্ত বা বর্ষা যেমন আনন্দ, প্রেম ও নবজাগরণের প্রতীক, শীতের পৌষ এখানে ঠিক তার বিপরীত—রিক্ততা, ক্ষয় ও বিচ্ছেদের রূপক।
হেমন্তের সোনার ধান কাটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর মাঠ যেমন শূন্যতায় খাঁ খাঁ করে, পৌষের আগমন প্রকৃতির সেই সজীবতাকে কেড়ে নিয়ে এক ধুসর চাদরে ঢেকে দেয়। গাছের শুকিয়ে যাওয়া পাতা ঝরে পড়ার ধ্বনির মধ্যে কবি শুনতে পান বিদায়ের কান্না। একই সাথে এটি মানুষের জীবনযাত্রারও এক নিগূঢ় প্রতিচ্ছবি—কালের গতিতে প্রতিটি বছর মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং মৃত্যুর মতো এক অচিন দূরত্বের দিকে পথিককে এগিয়ে নিয়ে যায়।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. পৌষের রূপ ও আগমনী চিত্র

  • “পউষ এলো অশ্রু-পাথার হিম পারাবার পারায়ে / কুজঝটিকার ঘোম্‌টা-পরা দিগন্তরে দাঁড়ায়ে॥”
    কবি পৌষকে কোনো সাধারণ ঋতু হিসেবে দেখেননি; তাকে তুলনা করেছেন এমন এক বিষাদগ্রস্ত সত্তার সাথে, যে যেন এক বরফশীতল কান্নার সমুদ্র (‘অশ্রু-পাথার হিম পারাবার’) পার হয়ে এসেছে। শীতের ঘন কুয়াশাকে কবি দিগন্তের বধূর মুখের ‘ঘোমটা’ হিসেবে কল্পনা করেছেন।

২. বিদায়ের হাহাকার ও ক্ষয়িষ্ণুতা

  • “সে এলো আর পাতায় পাতায় হায় / বিদায়-ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়…”
    শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার প্রাকৃতিক ঘটনাটিকে কবি প্রকৃতির বুকভাঙা ক্রন্দন হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন। অস্তমিত সূর্যের মলিন আলো এবং সন্ধ্যাতারার বিলীন হওয়ার মাঝে এক আশাহীন বিদায়ের করুণ সুর ধরা পড়ে।

৩. কালের আয়ুক্ষয় ও অনিশ্চয়তার ভয়

  • “এক বছরের শ্রান্তি পথের, কালের আয়ু-ক্ষয় / পাকা ধানের বিদায়-ঋতু, নতুন আসার ভয়।”
    পৌষ মানেই একটি বাংলা পঞ্জিকাবর্ষের শেষের দিকে এগিয়ে চলা। পুরো বছরের ক্লান্তি এবং মানুষের মহাকালের আয়ু কমে যাওয়ার বার্তা নিয়ে আসে এই মাস। হেমন্তের পাকা ফসলের উৎসব শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভবিষ্যতে কী আসছে, সেই অনিশ্চয়তা ও ভীতি মনের ভেতরে দানা বাঁধে।

৪. পথিকের যাত্রা ও চিরন্তন বিদায়

  • “ওঠে পথিক! যাবে অনেক দূর / কালো চোখের করুণ চাওয়া ছাড়ায়ে॥”
    শীতের এই রিক্ততার মাঝে জীবন-পথের পথিককে সব পিছুটান ছেড়ে দূরযাত্রার উদ্দেশ্যে তৈরি হতে হয়। ভালোবাসার মানুষের চোখের করুণ মিনতি ও মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে একাকী অজানা পথে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা।

সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

  • প্রকৃতির ব্যক্তিস্বরূপায়ন (Personification): কবি প্রকৃতি ও ঋতুকে জীবন্ত রক্ত-মাংসের রূপ দিয়েছেন। পৌষ এখানে কুয়াশার ঘোমটা পরা এক বধূ, আর দিগন্ত যেন এক বিদায়ী সত্তা।
  • সমৃদ্ধ শব্দচয়ন: ‘অশ্রু-পাথার’, ‘হিম পারাবার’, ‘কুজঝটিকা’—তৎসম ও ভাবগম্ভীর শব্দের ব্যবহারে কাব্যের গাম্ভীর্য ও নান্দনিকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • চিত্রকল্প ও অলংকার: কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তের রেখা এবং ম্লান সন্ধ্যাতারার যে দৃশ্যপট কবি এঁকেছেন, তা এক নিখুঁত বিষাদময় দৃশ্যকাব্যের রূপ নেয়।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  • বাউল সুরের বিস্তার: গানটি বাংলার মাটি ও লোকায়ত দর্শনের সাথে জড়িত ‘বাউল’ সুররীতিতে নিবদ্ধ। বাউল সুরের স্বভাবজাত উদাসীনতা ও দেহতত্ত্বের শূন্যতাবোধ গানের বিদায় ও ক্ষয়িষ্ণুতার ভাবকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে।
  • লোফা তাল: ৬ মাত্রার লঘু ও গতিশীল ‘লোফা’ তালে গানটি সুরারোপিত। সুরের করুণ টান এবং তালের প্রবহমান দোলা শ্রোতার মনে এক গভীর নস্টালজিয়া সৃষ্টি করে।

রচনাপ্রেক্ষিত ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

গানটি যখন মাঘ ১৩২৯ বঙ্গাব্দে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ১৯২৩) প্রবাসী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন নজরুল কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে রাজবন্দী হিসেবে দিন কাটাচ্ছিলেন। কারাগারের চার দেয়ালের নির্জনতায় বসেও কবির সংবেদনশীল মন প্রকৃতির ঋতুবদলের বেদনাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল। পরবর্তীতে এটি দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৩০ সালে নজরুল গীতিকা-য় সংগীতরূপে প্রকাশিত হয়। মাসুদা আনামসহ বহু প্রথিতযশা শিল্পীর কণ্ঠে গানটি রের্কড ও পরিবেশিত হয়েছে।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. দোলন-চাঁপা (প্রথম সংস্করণ, আশ্বিন ১৩৩০ বঙ্গাব্দ), কাজী নজরুল ইসলাম।
  2. নজরুল গীতিকা (ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ / সেপ্টেম্বর ১৯৩০), কাজী নজরুল ইসলাম।
  3. নজরুল রচনাবলী (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, ১ম ও ৩য় খণ্ড), বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
  4. প্রবাসী পত্রিকা (মাঘ ১৩২৯ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৫৩০)।

 

 

 

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।