বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে ‘ফিডব্যাক’ কেবল একটি ব্যান্ডের নাম নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার আবেগ, স্মৃতি ও ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সংগীত-অধ্যায়। ‘মৌসুমী’, ‘মেলা’, ‘চিঠি’, ‘ময়ূরী আকাশ’ কিংবা ‘ফিরে এসো’র মতো গান দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। সদস্য পরিবর্তন, সংগীতের ধারায় বিবর্তন এবং সময়ের নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে পাঁচ দশকের পথচলায় নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে ফিডব্যাক।
এবার সেই দীর্ঘ যাত্রার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যান্ডটি। নতুন অ্যালবাম প্রকাশ, জনপ্রিয় পুরোনো গান নতুন সংগীতায়োজনে উপস্থাপন এবং ব্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ৫০ বছর পূর্তিকে ঘিরে ফিডব্যাকের লক্ষ্য শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা।
Table of Contents
নতুন অ্যালবামে ফিরছে ফিডব্যাক
ফিডব্যাকের নতুন অ্যালবামের অপেক্ষায় রয়েছেন দীর্ঘদিনের ভক্তরা। প্রায় ১১ বছরের বিরতি পেরিয়ে নতুন গান নিয়ে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যান্ডটি। এরই মধ্যে ছয়টি নতুন গান তৈরি করা হয়েছে। তবে গানগুলোর নাম, বিষয়বস্তু কিংবা প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে এখনই বিস্তারিত জানাতে চান না সদস্যরা। তাঁদের পরিকল্পনা, পর্যায়ক্রমে গান প্রকাশ করে শ্রোতাদের জন্য চমক তৈরি করা।
ব্যান্ডটির কি-বোর্ডশিল্পী ফোয়াদ নাসের বাবু জানিয়েছেন, সুবর্ণজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এগোতে চান তাঁরা। আয়োজনের আড়ম্বরের চেয়ে সংগীতের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে আগ্রহী ব্যান্ডের সদস্যরা।
নতুন গানের পাশাপাশি পুরোনো জনপ্রিয় গানগুলোও নতুনভাবে শ্রোতাদের সামনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব গানে অন্য ব্যান্ডের সদস্য কিংবা একক সংগীতশিল্পীদের কণ্ঠ যুক্ত হতে পারে। নতুন সংগীতায়োজনের মাধ্যমে পরিচিত গানগুলোকে সময়োপযোগী করে তোলার পাশাপাশি মূল সুর ও আবেগ অক্ষুণ্ন রাখার সুযোগও তৈরি হবে।
এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ফিডব্যাকের গানগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। যাঁরা ক্যাসেটের যুগে ‘মেলা’ শুনেছেন, তাঁদের কাছে গানগুলো পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে। আবার যাঁরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গান শোনেন, তাঁদের কাছেও ব্যান্ডটির সমৃদ্ধ সংগীতভান্ডার নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
পাঁচ দশকের গল্প নিয়ে তথ্যচিত্র
ফিডব্যাকের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে প্রায় ২৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে ব্যান্ডটির সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে পাঁচ দশকের সংগীতযাত্রা, সদস্যদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সময়ের সঙ্গে ব্যান্ডের পরিবর্তনের নানা দিক।
একটি ব্যান্ডের দীর্ঘ পথচলা কেবল গান প্রকাশ কিংবা মঞ্চে পরিবেশনার হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সংগীতচর্চার পরিবেশ, শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিকূলতা পেরিয়ে টিকে থাকার গল্প। তথ্যচিত্রে এসব অভিজ্ঞতা উঠে এলে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সংরক্ষিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ফোয়াদ নাসের বাবুর ভাষ্য, পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান তাঁরা। তাঁর কথায়, ‘আমাদের কিন্তু আকাশচুম্বী বা উচ্চাভিলাষী কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে পারছি না। সামগ্রিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে আমরা এগোব। তবে শ্রোতারা আমাদের গানের জন্যই ভালোবাসেন। আমরা গানে গানে ৫০ বছর উদ্যাপন করতে চাই।’
সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২৪ অক্টোবর শনিবার বিকেল চারটায় ঢাকার ফার্মগেটে ডেইলি স্টার সেন্টারের এ এস মাহমুদ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যরা তাঁদের পরিকল্পনা ও আয়োজনের বিস্তারিত তুলে ধরবেন।
চট্টগ্রামে শুরু, ঢাকায় শেষ
ফিডব্যাকের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে চট্টগ্রাম। সেখানকার একটি কনসার্টের মধ্য দিয়ে আয়োজন শুরু করতে চায় ব্যান্ডটি। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে শ্রোতাদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে ২০২৭ সালের অক্টোবরে, ব্যান্ডটির ৫০ বছর পূর্তির মাসে, ঢাকায় সমাপনী আয়োজন করার কথা ভাবছে তারা।
চট্টগ্রামের সঙ্গে ফিডব্যাকের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ব্যান্ডটির স্মৃতিতে শহরটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম ক্লাবের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রথম সেখানে গান পরিবেশন করে ফিডব্যাক। পরে মুসলিম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় তাদের প্রথম দিককার একটি উন্মুক্ত পরিবেশনা। এরপর বছরের পর বছর শহরটিতে কনসার্ট করেছে দলটি।
ফোয়াদ নাসের বাবুর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কোনো কোনো বছর চট্টগ্রামে ১২ থেকে ১৪টি অনুষ্ঠান করেছে ফিডব্যাক। পাঁচ দশকের পথচলায় শহরটিতে পাঁচ শতাধিক কনসার্টে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে ব্যান্ডটির।
চট্টগ্রামের শ্রোতাদের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বাবু বলেন, ‘সারা দেশে কনসার্ট করে দেখেছি, আর চট্টগ্রামেও দেখেছি। আমাদের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে। সেখানে আমরা রাস্তায়ও বের হতে পারি না। আগে যেমন মানুষ অটোগ্রাফ নিতে, ছবি তুলতে আসত, এখনো সেই উন্মাদনা দেখি। আমরাও চট্টগ্রামের মানুষের এই ভালোবাসা বেশ উপভোগ করি। আমরা সব সময় বলি, চট্টগ্রাম ফিডব্যাকের জন্য লাকি।’
এই বক্তব্যে দীর্ঘদিনের শ্রোতা-সম্পর্কের একটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনপ্রিয়তা শুধু গানের পরিচিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিল্পীদের সঙ্গে শ্রোতাদের ব্যক্তিগত সংযোগও সময়ের সঙ্গে তার শক্তি বাড়ায়। চট্টগ্রামের সঙ্গে ফিডব্যাকের সম্পর্ক সেই ধারাবাহিকতারই উদাহরণ।
আলট্রাসোনিকস থেকে ফিডব্যাকের জন্ম
ফিডব্যাকের যাত্রার শুরু ১৯৭৭ সালে। আলট্রাসোনিকস ব্যান্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আরও কয়েকজন সংগীতপ্রেমী মিলে গড়ে তোলেন নতুন দলটি। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ফিডব্যাক টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’।
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মধ্যে ছিলেন এরশাদ মঈনুদ্দিন পপসি—ড্রামস, মুরাদ রহমান—বেজ গিটার, সেলিম হায়দার—লিড গিটার, জাকিউর রহমান—গিটার ও ভোকাল এবং ফোয়াদ নাসের বাবু—কি-বোর্ড। অতিথি শিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন কিংসলে রিক্টার, সানু রিক্টার ও স্যান্ড্রা হফ। ব্যান্ডটির সে সময়কার ব্যবস্থাপক ছিলেন হাফিজুর রহমান।
শুরুর দিকে জনপ্রিয় বিদেশি গান কাভার করেই মূলত সংগীত পরিবেশন করত দলটি। ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে। একসময় তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে নিয়মিত গান পরিবেশনের আমন্ত্রণ পায় ফিডব্যাক। সপ্তাহে তিন দিন সেখানে গান গাইত ব্যান্ডটি। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
এই সময়ের মধ্যে কয়েকজন সদস্য বিদেশে চলে গেলে দলে যুক্ত হন পিয়ারু খান ও মাকসুদুল হক। ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে নাম থেকে ‘টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’ অংশটি বাদ পড়ে। এরপর ‘ফিডব্যাক’ নামেই পরিচিতি পায় ব্যান্ডটি।
শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘শুরুর দিনগুলোতে বেশ এক্সাইটেড ছিলাম। তখনকার বিভিন্ন জনপ্রিয় গান গাইতাম। ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে শুরু করে। প্রথম স্টেজ শোর ডাক আসে তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে।’
বিদেশি গান কাভার দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে নিজস্ব গান ও অ্যালবামের মধ্য দিয়ে ফিডব্যাক বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে। তাদের সংগীতযাত্রা তাই শুধু একটি দলের বিকাশের গল্প নয়, বরং দেশের ব্যান্ড সংগীতের পরিবর্তন ও বিস্তারের ইতিহাসের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রথম উন্মুক্ত কনসার্ট ও অ্যালবামের পথচলা
হোটেলে নিয়মিত গান পরিবেশনের অভিজ্ঞতা থেকে একসময় সাধারণ শ্রোতাদের সামনে বড় পরিসরে সংগীত পরিবেশনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিডব্যাক। ১৯৭৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর লিও ক্লাবের উদ্যোগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম উন্মুক্ত কনসার্ট। সেই পরিবেশনায় শ্রোতাদের সাড়া তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
১৯৮১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জন্য প্রথম গান রেকর্ড করে ব্যান্ডটি। গানটির নাম ‘এই দিন চিরদিন’। এরপর অ্যালবাম প্রকাশের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি বাড়তে থাকে।
১৯৮৫ সালে সারগাম থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম অ্যালবাম ‘ফিডব্যাক’। ১৯৮৭ সালে আসে ‘উল্লাস’। এরপর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘মেলা’ ব্যান্ডটির জনপ্রিয়তার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়। অ্যালবামটির গান শ্রোতাদের মধ্যে এমন সাড়া ফেলেছিল যে অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে বারবার শোনার সঙ্গী।
ফোয়াদ নাসের বাবুর স্মৃতিতে এমন এক শ্রোতার কথা রয়েছে, যিনি ‘মেলা’ এতবার শুনেছিলেন যে ক্যাসেটের ফিতা পর্যন্ত ছিঁড়ে গিয়েছিল। ক্যাসেটের যুগে একটি অ্যালবামের জনপ্রিয়তা বোঝাতে এমন অভিজ্ঞতা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তখন গান বারবার শোনার জন্য একই ক্যাসেট ব্যবহার করতে হতো; পছন্দের গান কিংবা অ্যালবামের সঙ্গে শ্রোতাদের সম্পর্কও তৈরি হতো দীর্ঘ সময় ধরে।
১৯৯২ সালে কলকাতার এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয় ফিডব্যাকের ‘জোয়ার’। কোনো বাংলাদেশি ব্যান্ডের এইচএমভি থেকে অ্যালবাম প্রকাশের প্রথম ঘটনা হিসেবে এটিকে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের জন্য এটি ছিল উল্লেখযোগ্য অর্জন।
এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ (১৯৯৪), ‘দেহঘড়ি’ (১৯৯৫), ‘বাউলিয়ানা’ (১৯৯৬), ‘আনন্দ’ (১৯৯৯), ‘এই শতাব্দীর ফিডব্যাক’ (২০০০), ‘শূন্য ২’ (২০০২) এবং ‘এখন’ (২০১৫)। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত এসব অ্যালবামে ব্যান্ডটির সংগীতচর্চার ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে।
২০১৫ সালের ‘এখন’-এর পর দীর্ঘ বিরতি। এবার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নতুন অ্যালবাম প্রকাশের প্রস্তুতি সেই বিরতি ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে অ্যালবামের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সদস্য পরিবর্তন, কিন্তু থামেনি সংগীতযাত্রা
পাঁচ দশকের পথচলায় ফিডব্যাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অনেক সংগীতশিল্পী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুরাদ হোসেন, মাকসুদুল হক, ওমর খালেদ রুমি, মুসা রহমান, রেশাদ মাহমুদ ও হাফিজুর রহমান। বিভিন্ন সময়ে সদস্য পরিবর্তিত হলেও ব্যান্ডটির সংগীতচর্চা অব্যাহত থেকেছে।
বর্তমানে ফিডব্যাকের সদস্যরা হলেন লাবু রহমান—গিটার ও ভোকাল, এনাম এলাহি টন্টি—ড্রামস ও পারকাশন, রায়হান হাসান—ভোকাল ও অ্যাকুস্টিক গিটার, ফোয়াদ নাসের বাবু—কি-বোর্ড, মোহাম্মদ দানেশ—বেজ গিটার এবং রবিউল আলম রিয়েল—ভোকাল।
একটি ব্যান্ডের দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে শুধু জনপ্রিয় গান থাকলেই হয় না। প্রয়োজন সংগীতের প্রতি দায়বদ্ধতা, সদস্যদের মধ্যে কাজের ধারাবাহিকতা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের মানসিকতা। ফিডব্যাকের পাঁচ দশকের ইতিহাসে এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যে গানগুলো শ্রোতাদের মনে গেঁথে আছে
ফিডব্যাকের জনপ্রিয় গানের তালিকা দীর্ঘ। ‘মৌসুমী’, ‘চিঠি’, ‘আমার নতুন আকাশে’, ‘মেলা’, ‘ফিরে এসো’, ‘ময়ূরী আকাশ’, ‘মাঝি’, ‘করি মানা’, ‘জনম দুঃখী’, ‘আদম হাওয়া’, ‘মন আজ আমার’, ‘কেমন আছি’, ‘ফসলের গান’, ‘প্রতারণা’, ‘এক আকাশ’, ‘হৃদয়ে হৃদয়ে’ এবং ‘উড়ু উড়ু মনটা’—এমন অনেক গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিত।
গানগুলোর আবেদন এক রকম নয়। কোথাও প্রেম ও বিরহ, কোথাও জীবনের টানাপোড়েন, আবার কোথাও রয়েছে সম্পর্ক ও অনুভূতির নানা প্রকাশ। এই বৈচিত্র্যই ব্যান্ডটির সংগীতভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘদিনের শ্রোতাদের কাছে গানগুলো যেমন স্মৃতির অংশ, তেমনি নতুন শ্রোতাদের জন্যও এগুলো বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
ব্যান্ডটির অর্জনের তালিকায় রয়েছে ১৯৯৫ সালের ‘যায়যায়দিন বেস্ট ব্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১৭ সালের ‘আরটিভি বেস্ট ব্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’। এসব স্বীকৃতি তাদের সংগীতযাত্রার উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হলেও ফোয়াদ নাসের বাবুর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন শ্রোতাদের ভালোবাসা।
সুবর্ণজয়ন্তীতে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার প্রত্যাশা
ফিডব্যাকের পাঁচ দশকের যাত্রায় সময় বদলেছে, বদলেছে গান শোনার মাধ্যমও। ক্যাসেট থেকে সিডি, পরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সংগীত পৌঁছে দেওয়ার পথ এখন আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একই সঙ্গে নতুন নতুন ব্যান্ড ও শিল্পীর আবির্ভাবে সংগীতের জগৎও হয়েছে বৈচিত্র্যময়।
এই পরিবর্তনের মধ্যেও পুরোনো শ্রোতাদের ভালোবাসা ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের গান পৌঁছে দেওয়া ফিডব্যাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নতুন অ্যালবাম, পুরোনো গানের নতুন পরিবেশনা এবং তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা সেই লক্ষ্য পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ফোয়াদ নাসের বাবুর দৃষ্টিতে একটি সংগীতদলকে টিকিয়ে রাখতে হলে সেটিকে একটি প্রতিষ্ঠানের মতো যত্নে গড়ে তুলতে হয়। শুধু জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়; প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, দায়িত্ববোধ এবং শ্রোতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার আন্তরিকতা।
ফিডব্যাকের সুবর্ণজয়ন্তী তাই কেবল ৫০ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের একটি দীর্ঘ অধ্যায় ফিরে দেখার সুযোগ, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। নতুন ছয়টি গান নিয়ে ব্যান্ডটির পরিকল্পনা, পুরোনো গান নতুনভাবে পরিবেশনের উদ্যোগ এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বিস্তৃত উদ্যাপনের আয়োজন—সব মিলিয়ে সামনে অপেক্ষা করছে সংগীতময় এক অধ্যায়।
পাঁচ দশক পেরিয়েও ফিডব্যাকের মূল শক্তি সেই গান, যা শ্রোতাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি করেছে। সময়ের হিসাবে ৫০ বছর পূর্ণ হতে চললেও ব্যান্ডটির বার্তা যেন একটাই—সংগীতের পথচলা থেমে নেই। সত্যিকার অর্থেই, ফিফটি নট আউট।













![তত্ত্ব তুই ডুবলে পরে রতন পাবি [ Tui Duble Pore Roton Pabi ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/তুই-ডুবলে-পরে-রতন-পাবি-1024x576.webp)

