ভৈরব ঠাট । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত – এর রাগভিত্তিক কাঠামোতে “ঠাট” একটি মৌলিক ধারণা। ঠাটের মাধ্যমেই রাগগুলিকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় এবং তাদের বৈশিষ্ট্যগত স্বরবিন্যাস নির্ধারিত হয়। এই ঠাটগুলোর মধ্যে ভৈরব ঠাট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এটি ভোরের রাগসমূহের কেন্দ্রবিন্দু এবং শাস্ত্রীয় সংগীতে এক গভীর ভাবগাম্ভীর্যের ধারক।

ভৈরব ঠাট : হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক ঐতিহ্যবাহী স্তম্ভ

ঠাট কী?

ঠাট বলতে বোঝায় এমন একটি স্যাম্পল স্কেল বা আদর্শ স্বরবিন্যাস, যার ওপর ভিত্তি করে বহু রাগ গঠিত হয়। সাধারণত একটি ঠাটে—

  • সাতটি স্বর থাকে (সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি),
  • আরোহ-অবরোহ সরল ও নিয়মাবদ্ধ,
  • ঠাটে গাযকী/মেয়ে-কণ্ঠের কঠোর নিয়ম নেই, বরং রাগে আছে অলংকার, নিয়ম ও চলন।

 

 

ভৈরব ঠাটের স্বরবিন্যাস

ভৈরব ঠাটের স্বরসমূহ নিম্নরূপ —

সা – রে(কোমল) – গা – মা – পা – ধা(কোমল) – নি – সা

এখানে বিশেষত্ব হলো—রে ও ধা উভয়ই কোমল (flat) স্বরে ব্যবহৃত। এই কোমল স্বরদ্বয়ই ভৈরব ঠাটকে তার গাম্ভীর্য ও তীব্রতার আবহ দেয়।

ভৈরব ঠাটের আবহ ও রস

ভৈরব ঠাট-ভিত্তিক রাগগুলো সাধারণত—

  • ভোর-প্রকৃতির (প্রথম প্রহর)
  • ভক্তিরস, বীররস বা গম্ভীর ভাবপ্রধান
  • ধ্যান, বৈরাগ্য, তপস্যার আবেশময়

এই ঠাটের রাগগুলোতে সূর্যোদয়ের প্রশান্ত পরিবেশ, মন্দিরঘণ্টার ধ্বনি এবং আধ্যাত্মিক অনুরণন যেন একাকার হয়ে যায়।

ভৈরব ঠাটের প্রধান রাগসমূহ

ভৈরব ঠাট থেকে উদ্ভূত উল্লেখযোগ্য রাগগুলো হলো—

১) ভৈরব

এই ঠাটের নামানুসারেই রাগটি গঠিত। রাগ ভৈরব কেবল একটি সঙ্গীতরূপ নয়, বরং দেবতা ভৈরবের ভাবমূর্তির প্রতীক—ভক্তি, ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা ও অচঞ্চল স্থিতি এর সুরধারায় ধরা পড়ে।

২) আহির ভৈরব

ভৈরব ও কাফির সংমিশ্রণে রচিত এই রাগটি তুলনামূলক কোমল ও কাব্যিক। ভোরের নির্মলতাকে এ রাগ অসাধারণভাবে প্রকাশ করে।

৩) নাট ভৈরব

ভৈরবের গাম্ভীর্যের সঙ্গে নাট রাগের দীপ্ততা যুক্ত করে।

৪) রামকালী

ভক্তিরস ও বৈরাগ্যের অন্যতম রাগ। শিখ ও ভজন-সংগীতেও রামকালীর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।

৫) গুনকালী, জোগিয়া, বিবাস

এসব রাগ ভৈরব ঠাটের গাম্ভীর্যকে ভিন্ন রূপে প্রকাশ করে—কখনো কাব্যিক, কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো ধ্যানস্থ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ভৈরব ঠাটের ধারণাকে আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রতিষ্ঠা দেন সংগীততাত্ত্বিক বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে। তিনিই প্রথম রাগগুলোকে ১০টি ঠাটে শ্রেণিবদ্ধ করেন। তার প্রবর্তিত এই পদ্ধতির মাধ্যমেই ভৈরব ঠাট পায় একটি সুসংহত তাত্ত্বিক কাঠামো।

সংগীতে প্রয়োগ ও পরিবেশনশৈলী

ভৈরব ঠাটের রাগ গাওয়ার সময় সাধারণত—

  • ধীর গতির আলাপ দিয়ে সূচনা করা হয়,
  • রে ও ধা-তে ‘আন্দোলন’ (gentle oscillation) প্রয়োগ করা হয়,
  • তান ও দ্রুত লয়ে খুব বেশি না গিয়ে গাম্ভীর্য বজায় রাখা হয়,
  • তাল হিসেবে প্রায়শই ত্রিতাল, একতাল বা ঝাঁপতাল ব্যবহৃত হয়।

ইন্সট্রুমেন্টাল সঙ্গীতে—সেতার, সরোদ, বাঁশি এবং এসরাজে ভৈরব ঠাটের রাগগুলোতে গভীর আবেগ ফুটে ওঠে।

আধ্যাত্মিকতা ও দর্শন

ভৈরব ঠাটের স্বরবিন্যাসে যেন এক অন্তর্লীন দর্শন কাজ করে।
এটি কেবল শ্রুতি নয়, ধ্যান ও আত্মোপলব্ধির বাহন। অনেক সাধকশিল্পী ভৈরব ঠাটের রাগকে প্রাতঃকালের উপাসনার সাথে তুলনা করে থাকেন।

হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ভৈরব ঠাট হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কেবল একটি সংগীততাত্ত্বিক কাঠামো নয়—এ এক দর্শন, এক ধ্যানধারা, এক আবেগের প্রকাশভাষা। কোমল রে ও ধায়ের মিশ্রণে যে গাম্ভীর্য ও বৈরাগ্যের সুর জন্ম নেয়, তা শ্রোতার হৃদয়কে করে তোলে গভীরভাবে স্পর্শকাতর। ভোরের স্তব্ধতায় ভৈরব ঠাটের রাগ যখন বেজে ওঠে, তখন সংগীত হয়ে ওঠে প্রার্থনা—আর সুর হয়ে ওঠে এক গভীর আত্মোপলব্ধির পথ।