লোকসংগীতের আবেগভরা স্বর আর মরমী বাঁশির সুরে যিনি শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছেন, সেই শিল্পী বারী সিদ্দিকীর আজ সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। জীবদ্দশায় মেলে ধরা ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রোতার অপরিসীম স্বীকৃতি সত্ত্বেও তাঁর মনের ভেতরের অপূর্ণতা তাঁকে সবসময় তাড়া করত। কাছের মানুষদের কাছে বহুবার আক্ষেপ করে বলেছেন—“ভাবতাম আরও বড় কিছু হবে; কিন্তু শেষে তা হলো না।”
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর অদম্য টান। গান ও বাঁশির প্রতি একধরনের আত্মিক আকর্ষণ তাঁকে গড়তে শুরু করে খুব ছোট বয়স থেকেই। পরিবারে ছিল সাংস্কৃতিক আবহ; তাঁর মা গান জানলেও সামাজিক বাধায় প্রকাশ করতেন না। কিন্তু সেই মা-ই ছিলেন ছেলের শিল্পী হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। নিয়মিত অনুশীলন, একরোখা সাধনা আর লড়াই করেই তিনি এগিয়ে যান। অথচ দীর্ঘ সময় বাঁশিবাদক হিসেবে সঠিক পরিচিতি পাননি। শুনতে হয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও। তবু বাঁশিই ছিল তাঁর প্রথম প্রেম। পরে যখন গান গাইতে শুরু করলেন, শ্রোতারা বিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিলেন—“এতদিন কোথায় ছিলেন?” এই প্রশংসা তাঁকে আনন্দ দিলেও মনে একরাশ বেদনা রয়ে গেছে—বাংলাদেশে তিনি সংগীতশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় হলেও তাঁর প্রাপ্য সম্মান বাঁশিবাদক হিসেবে অর্জিত হয়নি। অথচ বিদেশে বাঁশির সুরেই তিনি পেয়েছিলেন ব্যাপক স্বীকৃতি।
পেশাগত জীবনে তিনি কেবল গায়ক বা বংশীবাদক নন; ছিলেন একজন ব্যস্ত সুরকারও। সুবীর নন্দী, মনির খান, আসিফসহ দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের অসংখ্য গানে তিনি সুর দিয়েছেন। কিন্তু তিনি মনে মনে প্রশ্ন করতেন—“বাঁশির জন্য কি তবে মূল্যায়ন পাওয়া যায় না?”
বারী সিদ্দিকীর প্রকৃত জনপ্রিয়তা আসে হুমায়ূন আহমেদের মাধ্যমে। তাঁর নাটক ও চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘শুয়া চান পাখি’, ‘আমি একটা জিন্দা লাশ’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’—এসব গান আজও শ্রোতার মনে নস্টালজিয়ার ঢেউ তোলে। তাঁর গানে ছিল গ্রামীণ জীবন, মানবিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও মরমীবাদের অনন্য সমন্বয়, যা তাঁকে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে আলাদা আসনে বসিয়েছে।
তাঁকে স্মরণ করতে ‘বারী সিদ্দিকী স্মৃতি পরিষদ’ রামপুরা কার্যালয়ে আজ সন্ধ্যায় আয়োজন করছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সংগঠনের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন।
এনটিভিতে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ‘আজ সকালের গান’ অনুষ্ঠানে শিল্পী প্রিন্স আলমগীর পরিবেশন করবেন বারী সিদ্দিকীর জনপ্রিয় কয়েকটি গান—‘শুয়া চান পাখি’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘দেখবে খোদার মহান ছবি’, ‘পরশমণি’, ‘ওগো ভাবিজান নাও বাইয়া’, ‘আমার দয়াল রে’সহ আরও অনেক গান। শ্রোতাদের অনুরোধেও গান গাইবেন তিনি। কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলেও থাকছে এই কিংবদন্তি শিল্পীকে স্মরণ করার বিশেষ আয়োজন।
