সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৩:৫১ পিএম

বাংলা গানের স্বর্ণালি যুগের দিকে তাকালে যে কজন মানুষের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, গীতিকার কে জি মোস্তফা তাঁদের অন্যতম। তিনি কেবল সুরের ভুবনেই আলো ছড়াননি, একাধারে সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সম্পাদনা ও চলচ্চিত্র অঙ্গনেও রেখে গেছেন গভীর দাগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁর লেখা গান এ দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গী হয়ে আছে। বহু প্রতিভায় উজ্জ্বল এই গুণী মানুষের জীবন ও কর্মের পরিধি ছিল বেশ বিস্তৃত।
১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে জন্ম নেন কে জি মোস্তফা। শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। পড়াশোনায় মেধাবী এই মানুষটি ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার আগে থেকেই তিনি নিজেকে যুক্ত করেন তৎকালীন গণমাধ্যমের সঙ্গে।
সাংবাদিকতার জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ হিসেবে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন এবং একই বছর ‘দৈনিক মজলুম’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে যোগ দেন। পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে তিনি ‘সাপ্তাহিক জনতা’র সহকারী সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন। তাঁর তীক্ষ্ণ লেখনী ও কাজের দক্ষতা সমাদৃত হয়েছিল রাজনৈতিক অঙ্গনেও। ফলে ১৯৭০ সালে প্রবীণ রাজনীতিবিদ কফিলউদ্দীন চৌধুরীর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ঠিক ওই সময়েই পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন তাঁকে প্রথম শ্রেণির রেডিও সার্ভিসের জন্য মনোনীত করেছিল। তবে দেশের টান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নের কারণে তিনি সেই লোভনীয় সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি।
দেশ স্বাধীনের পর নতুন উদ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন কে জি মোস্তফা। ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’, ‘দৈনিক স্বদেশ’ এবং ‘দৈনিক জনপদ’-এর মতো নামী পত্রিকায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। মূলধারার সংবাদপত্রের পাশাপাশি বিনোদন সাংবাদিকতায়ও তাঁর আগ্রহ ছিল স্পষ্ট, যার প্রমাণ মেলে তাঁর সম্পাদিত বিনোদন মাসিক পত্রিকা ‘নূপুর’-এর পাতায়।
১৯৭৬ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আওতায় তিনি বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারে যোগ দেন। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) সহকারী সম্পাদক হিসেবে তাঁর নতুন কর্মজীবন শুরু হয়। কাজের প্রতি সততা ও দক্ষতার কারণে পরবর্তীতে তিনি সম্পাদক ও সিনিয়র সম্পাদক পদে উন্নীত হন। দীর্ঘ দুই দশক সরকারি দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৬ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন।
সরকারি চাকরি করলেও তাঁর ভেতরের সম্পাদক সত্তা কখনোই ঝিমিয়ে পড়েনি। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রকাশনা তাঁর হাত ধরেই সমৃদ্ধ হয়েছে। কিশোরদের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘নবারুণ’, সাহিত্যবিষয়ক মাসিক ‘পূর্বাচল’, ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সংবাদ’ এবং ‘সচিত্র বাংলাদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি দারুণ দক্ষতার পরিচয় দেন। এর বাইরে বাংলাদেশ স্কাউটসের মুখপত্র ‘অগ্রদূত’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন।
সব পরিচয়কে ছাপিয়ে কে জি মোস্তফা মানুষের কাছে অমর হয়ে আছেন তাঁর গানের জন্য। ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হতো। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশনের জন্য নিয়মিত গান লিখতে শুরু করেন। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। রোমান্টিকতা ও বিরহের মিশেলে তৈরি তাঁর গানগুলো বাংলা গানের ইতিহাসে মাইলফলক। যেমন—‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে’ কিংবা ‘আমি নেই ভাবতেই ব্যথায় মন ভরে যায়’। এই গানগুলো শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়।
উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী তালাত মাহমুদ তাঁর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব নামী ও গুণী কণ্ঠশিল্পী তাঁর লেখা গানে সুর মিলিয়েছেন। প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা আর জীবনের গভীর অনুভূতিগুলোকে তিনি খুব সাধারণ কিন্তু মর্মস্পর্শী শব্দে ফুটিয়ে তুলতেন। শুধু গান বা কবিতা নয়, সাহিত্যের অন্যান্য শাখা যেমন ছড়া, প্রবন্ধ ও গদ্যেও ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘একজন কে জি মোস্তফা’ নামের একটি বই।
চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকে একসময় তিনি সিনেমা নির্মাণেও যুক্ত হয়েছিলেন। ‘মায়ার সংসার’, ‘অধিকার’ এবং ‘গলি থেকে রাজপথ’ চলচ্চিত্রে তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে পর্দার পেছনে কাজ করেন। এছাড়া তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মানিত সদস্য ছিলেন। ‘কবিতাপত্র’ ও ‘সাহিত্য বাংলাদেশ’ নামের দুটি পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি ভালো পাণ্ডুলিপিও মেলাতেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যুক্ত ছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মতো জনকল্যাণমূলক কাজের সাথে। আজীবন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জীবদ্দশায় বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
২০২২ সালের ৮ মে চিরতরে চোখ খোলেন এই বহু মাত্রিক মানুষটি। তবে শরীরী প্রস্থান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ, বিশেষ করে তাঁর গানগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, স্মৃতি ও অনুভূতির এক অনন্ত সুর হয়ে বেঁচে আছে এবং থাকবে। বাংলা সংস্কৃতির এই পুরোধা ব্যক্তিত্বের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য