অমর একুশে বইমেলার প্রাণবন্ত পরিবেশে এবার যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা। বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের সুপরিচিত মুখ, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ইভা আরমান (যিনি শ্রোতাদের কাছে ইভা রহমান নামেই সমধিক পরিচিত) এবার আত্মপ্রকাশ করেছেন কবি হিসেবে। মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চিঠি’। সুরের ভুবন থেকে শব্দের মায়াজালে তাঁর এই পদার্পণ পাঠকদের মধ্যে বেশ কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। মেলা প্রাঙ্গণে ‘অন্যপ্রকাশ’-এর স্টলে বইটি পাওয়া যাচ্ছে এবং কাব্যপ্রেমীদের ভিড় সেখানে লক্ষ্য করা গেছে।
কাব্যের বিষয়বস্তু ও অন্তর্নিহিত দর্শন
‘চিঠি’ কাব্যগ্রন্থটি মোট ৪৮টি কবিতা দিয়ে সাজানো হয়েছে। এই গ্রন্থটির প্রতিটি কবিতা যেন এক একটি না বলা অনুভূতির স্মারক। কবি ইভা আরমান তাঁর লেখনীতে মানুষের মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত কথাগুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। নাম শুনেই বোঝা যায়, প্রতিটি কবিতাই যেন এক একটি সম্বোধন—কখনো তা প্রিয়জনের উদ্দেশে লেখা দীর্ঘশ্বাসের লিপি, কখনো নিজের অতলান্ত সত্তার কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান, আবার কখনোবা বহমান সময়ের প্রতি এক অব্যক্ত অভিমান। ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, স্মৃতি আর অপেক্ষার এক অদ্ভুত বুনন ফুটে উঠেছে এই গ্রন্থের প্রতিটি পাতায়।
ইভা আরমানের মতে, “আমাদের জীবনে এমন অনেক কথা থাকে যা আমরা মুখে বলতে পারি না, কিন্তু সেগুলো মনের কোণে জমানো থাকে। সেই জমে থাকা অব্যক্ত কথাগুলোকেই সাহিত্যের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি এই বইটিতে।”
শৈশব ও সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা
ইভা আরমানের এই সাহিত্যচর্চার মূলে রয়েছে গভীর পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর রক্তে মিশে আছে সাহিত্যের নির্যাস। তাঁর দাদা মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন কলকাতার তৎকালীন সময়ের একজন সুপরিচিত লেখক। ষাটের দশকে তাঁর প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থ ‘ছড়াইতি’ (১৯৬৩) এবং ‘জলসা’ (১৯৬৮) সাহিত্যমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। শৈশব থেকেই দাদার লাইব্রেরি আর তাঁর সাহিত্যকর্মের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা ইভার মনে লেখালেখির প্রতি এক সুপ্ত অনুরাগ তৈরি করেছিল। দীর্ঘ সংগীত জীবনের ব্যস্ততা কাটিয়ে অবশেষে সেই অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটল এই ‘চিঠি’র মাধ্যমে।
নিচে ইভা আরমানের শিল্পজীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বইয়ের তথ্য দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| গ্রন্থের নাম | চিঠি |
| লেখিকা | ইভা আরমান (ইভা রহমান) |
| প্রকাশনী | অন্যপ্রকাশ |
| কবিতার সংখ্যা | ৪৮টি |
| মূল উপজীব্য | প্রেম, বিরহ, স্মৃতি ও জীবনের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন |
| সঙ্গীত জীবন | ২০০৪ সালে প্রথম অ্যালবাম; মোট ২৪টি একক অ্যালবাম |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | কলকাতার ‘কলাকার’ অ্যাওয়ার্ড ও অন্যান্য |
সংগীত থেকে সাহিত্যে উত্তরণ
২০০৪ সালে ইভার প্রথম একক সংগীত অ্যালবাম প্রকাশের পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ধারাবাহিকভাবে ২৪টি একক অ্যালবাম উপহার দিয়ে তিনি বাংলা গানের জগতে নিজের এক শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মঞ্চে পারফর্ম করার পাশাপাশি তিনি অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। তবে সুরের মূর্ছনা থেকে কবিতার পঙক্তিতে আসা তাঁর জন্য মোটেও কঠিন ছিল না। তাঁর মতে, গান যেমন মনের আবেগ প্রকাশ করে, কবিতাও তেমনি হৃদয়ের গভীরতম কোণকে স্পর্শ করে।
মেলায় আসা দর্শনার্থীরা বলছেন, গায়িকা ইভার কণ্ঠের দরদ যেমন সবার চেনা, কবি ইভার কলমের ধার এবং আবেগও পাঠকদের একইভাবে মুগ্ধ করবে। মেলা প্রাঙ্গণে বইটির কাটতি এবং পাঠকদের ইতিবাচক সাড়া থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ‘চিঠি’ এবারের বইমেলার অন্যতম আলোচিত কাব্যগ্রন্থ হিসেবে স্থান করে নেবে। অমর একুশে বইমেলার এই বর্ণিল উৎসবে ইভা আরমানের ‘চিঠি’ হোক সাহিত্যের নতুন এক সেতুবন্ধন।
