অলঙ্কার । ধারণা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে “অলঙ্কার” একটি মৌলিক ধারণা, যার মাধ্যমে সুরের সৌন্দর্য ও অভিব্যক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। “অলঙ্কার” শব্দটির সংস্কৃত অর্থ—অলংকরণ, শোভা বৃদ্ধি বা সাজসজ্জা। সংগীতের পরিভাষায় অলঙ্কার বলতে বোঝায়—স্বরের ভিতরে বা স্বরের মধ্যে সৃষ্ট নান্দনিক অলংকরণ, যা পরিবেশনাকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও আবেগময়।

যেখানে কর্ণাটক সংগীতে এই ধারণার নাম “অলঙ্কারম”, সেখানে হিন্দুস্তানি ধারায় একে “পালটা” বা “অলঙ্কার”—উভয় নামেই ডাকা হয়। কণ্ঠসংগীত বা যন্ত্রসংগীত—উভয় ক্ষেত্রেই অলঙ্কার প্রযোজ্য এবং এটি শিল্পীর সৃজনশীলতা ও তালিমের নিদর্শন।

পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র

অলঙ্কারের ধারণাগত ভিত্তি

অলঙ্কার মূলত স্বরের ধারায় তৈরি সৌন্দর্যরূপী বিন্যাস। একজন শিল্পী রাগের কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বরকে বিভিন্ন ভঙ্গিতে সাজিয়ে তোলেন অলঙ্কারের মাধ্যমে—যেটি হয় প্রাচীন সংগীততত্ত্ব অনুসরণ করে, অথবা নিজস্ব শৈল্পিক বোধের প্রয়োগে।

ভারতীয় সংগীততত্ত্বে অলঙ্কারের সম্ভাবনাকে ধরা হয়েছে অসীম হিসেবে—কারণ স্বরের গতি, কম্পন ও সংযোজনের অসংখ্য রূপ থাকতে পারে। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংগীততত্ত্ববিদেরা শিক্ষা ও অনুশীলনের সুবিধার জন্য অলঙ্কারকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বিন্যাস করেছেন।

ঐতিহাসিক বিবর্তন

ভারতীয় সংগীতশাস্ত্রে অলঙ্কারের ধারণা প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান। বিভিন্ন পর্যায়ে সংগীততাত্ত্বিকেরা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক অলঙ্কারের উল্লেখ করেছেন—

  • দত্তিল (Dattila) – ১৩টি অলঙ্কার
  • Bharata Muni – ৩৩টি অলঙ্কার
  • Sarngadeva – ৬৩টি অলঙ্কার

মধ্যযুগীয় কালে আরও বহু অলঙ্কার যুক্ত হয়েছে। প্রত্যেকেই তাঁদের গ্রন্থে অলঙ্কারের রূপ, প্রয়োগ ও সৌন্দর্যব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান এর কাছে তালিম নিচ্ছেন ওস্তাদ আলী আকবর খান ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান এর কাছে তালিম নিচ্ছেন ওস্তাদ আলী আকবর খান ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর

যৌক্তিক ও অযৌক্তিক অলঙ্কার

ভারতীয় সংগীততত্ত্বে অলঙ্কার দুই ভাগে বিভক্ত—

যৌক্তিক অলঙ্কার (Rational)

যেসব অলঙ্কার নির্দিষ্ট স্বরধারার বিন্যাস বা গাণিতিক প্যাটার্ন দ্বারা ব্যাখ্যাযোগ্য—সেগুলি যৌক্তিক।

অযৌক্তিক অলঙ্কার (Irrational)

যেগুলো নির্দিষ্ট স্কেল ডিগ্রি বা গণিতের নিয়মে বেঁধে রাখা যায় না—তাদেরকে বলা হয় অযৌক্তিক অলঙ্কার। এইগোষ্ঠীর মধ্যেই পড়ে গামক—যাঁর মধ্যে রয়েছে স্বরের অনিয়মিত দোলন, কম্পন ও মীন্ডের নানা রূপ।

অন্নপূর্ণা দেবী তার পিতা ও গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছ থেকে সুরবাহারের তালিম নিচ্ছেন
অন্নপূর্ণা দেবী তার পিতা ও গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছ থেকে সুরবাহারের তালিম নিচ্ছেন

অলঙ্কারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকারভেদ

নীচে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বহুল ব্যবহৃত অলঙ্কারগুলো তুলে ধরা হলো—

মীন্ড (Meend)

মীন্ড হল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অলংকার, যেখানে একটি স্বর থেকে অন্য স্বরে মসৃণ ও ধারাবাহিকভাবে সরে যাওয়া হয়। এতে স্বরগুলির মাঝে কোনো হঠাৎ ছেদ থাকে না, বরং একটি তরলের মতো ধীরে ধীরে স্বর পরিবর্তিত হয়। মীন্ডের মাধ্যমে সঙ্গীতে আবেগের প্রবাহ সৃষ্টি হয়, যা শ্রোতার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে রাগ সংগীতে মীন্ড রাগের সৌন্দর্য ও স্বভাব প্রকাশে বড় ভূমিকা রাখে। যেমন—রাগ দরবারি বা মালকোঁস-এর মতো রাগে মীন্ড ছাড়া আবেগপূর্ণ রূপ কল্পনাই করা যায় না। কণ্ঠসঙ্গীতে গলার নমনীয়তার মাধ্যমে এবং যন্ত্রসঙ্গীতে তার টানার সাহায্যে মীন্ড করা হয়। মীন্ডের সঠিক প্রয়োগে স্বরের কোমলতা, বেদনা, আনন্দ বা গাম্ভীর্য সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। এজন্য মীন্ডকে বলা হয় “স্বরের ভাষা”, যা সঙ্গীতকে জীবন্ত করে তোলে।

 

কান-স্বর (Kan Swar)

কান-স্বর হল মূল স্বরের আগে বা পরে অতি ক্ষুদ্র এবং হালকা স্বরের প্রয়োগ, যাকে পাশ্চাত্য সঙ্গীতে grace note বলা হয়। এটি মূল স্বরের সৌন্দর্য বাড়াতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নিজে কখনো প্রধান হয়ে ওঠে না। কান-স্বরের কাজ হল স্বরকে অলংকৃত করা, যেমন ফুলের পাশে ছোট কুঁড়ির মতো। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কান-স্বর রাগের সূক্ষ্ম রস ফুটিয়ে তোলে এবং স্বরের চলনকে প্রাণবন্ত করে। বিশেষ করে খেয়াল ও ঠুমরির মতো ধারায় কান-স্বর অত্যন্ত কার্যকরী। এটি শ্রোতার কানে একধরনের মাধুর্য সৃষ্টি করে এবং সঙ্গীতকে একঘেয়ে হতে দেয় না। কান-স্বর যথাযথভাবে প্রয়োগ না করলে রাগের চরিত্র বিকৃত হতে পারে, তাই এর ব্যবহারে সংযম ও দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজন। একটি সুগঠিত কান-স্বর গানকে আরও আভিজাত্য প্রদান করে।

 

আন্দোলন (Andolan)

আন্দোলন হল নির্দিষ্ট স্বরে হালকা ও ধীর গতিতে কম্পন সৃষ্টি করা। এটি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের vibrato-র মতো হলেও ভারতীয় সঙ্গীতে এর প্রয়োগ বেশি সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত। সাধারণত কোমল স্বরে, যেমন কোমল গান্ধার বা কোমল নিষাদে আন্দোলন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হল স্বরকে আরও সংবেদনশীল ও আবেগপূর্ণ করা। আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্বর শুধু একটি বিন্দুতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি অনুভূতির বিস্তার লাভ করে। যেমন—রাগ দরবারিতে আন্দোলনের ব্যবহার রাগকে গম্ভীর ও আবেগময় করে তোলে। আন্দোলন অতিরিক্ত হলে স্বরের শুদ্ধতা নষ্ট হতে পারে, আবার কম হলে কাঙ্ক্ষিত আবেগ প্রকাশ পায় না। তাই আন্দোলনের সৌন্দর্য নিহিত আছে তার ভারসাম্যে। সঠিক আন্দোলন শ্রোতার মনে করুণ, শান্ত বা গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করতে সক্ষম, যা সঙ্গীতের আসল লক্ষ্য পূরণ করে।

 

গামক (Gamaka)

গামক হল একাধিক স্বরের দোলনাময় বা ঝাঁকুনিপূর্ণ আন্দোলন, যা সঙ্গীতে শক্তি ও গভীরতা যোগ করে। এতে স্বরগুলো দ্রুত ওঠানামা করে, তবে নিয়ন্ত্রিত ও শাস্ত্রীয় কাঠামোর মধ্যেই। গামকের ব্যবহার বিশেষ করে ধ্রুপদ ও কর্ণাটক সঙ্গীতে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এটি রাগের গাম্ভীর্য ও মহিমা প্রকাশে সহায়ক। গামক প্রয়োগ করলে সঙ্গীতে একধরনের পৌরুষ, দৃঢ়তা ও ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়। যেমন—রাগ ভৈরব বা তোড়িতে গামকের প্রয়োগে রাগ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গামক গাইতে বা বাজাতে প্রচুর অনুশীলনের প্রয়োজন হয়, কারণ এতে শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও স্বরের শুদ্ধতা বজায় রাখা কঠিন। সঠিক গামক সঙ্গীতকে শুধুমাত্র শ্রুতিমধুর নয়, বরং শক্তিশালী ও গভীর অর্থবহ করে তোলে।

 

খাটকা / গিটকারী (Khatka / Gitkari)

খাটকা বা গিটকারী হল অত্যন্ত দ্রুত গতিতে স্বরগুচ্ছের স্পষ্ট উচ্চারণ। এতে স্বরগুলো আলাদা আলাদা করে খুব দ্রুত উচ্চারিত হয়, কিন্তু অস্পষ্টতা আসে না। এটি সঙ্গীতে চঞ্চলতা ও কৌশল প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। খাটকার মাধ্যমে শিল্পীর দখল ও দক্ষতা প্রকাশ পায়। সাধারণত তান বা দ্রুত আলাপে খাটকার ব্যবহার দেখা যায়। এটি গানকে গতিশীল করে এবং শ্রোতাকে মুগ্ধ করে তোলে। খাটকা উচ্চারণে জিভ, শ্বাস ও গলার নিখুঁত সমন্বয় প্রয়োজন। ভুল প্রয়োগে স্বরের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যায় এবং রাগের রস কমে যায়। দক্ষ শিল্পীর খাটকা শুনলে মনে হয় যেন মুক্তোর দানা ঝরে পড়ছে। তাই খাটকা কেবল কৌশল নয়, বরং সঠিক প্রয়োগে এটি সঙ্গীতের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

মুর্কি (Murki)

মুর্কি হল খাটকার তুলনায় আরও সূক্ষ্ম, হালকা ও কোমল স্বরবিন্যাস। এতে খুব অল্প সময়ে একাধিক স্বরের স্পর্শ ঘটে, কিন্তু তা অত্যন্ত মসৃণ ও অলংকারস্বরূপ হয়। মুর্কির মূল উদ্দেশ্য হল সঙ্গীতে মাধুর্য যোগ করা, কৌশল প্রদর্শন নয়। এটি ঠুমরি, দাদরা ও খেয়াল গানে বেশি ব্যবহৃত হয়। মুর্কি ব্যবহারে গান আরও রসালো ও আবেগময় হয়ে ওঠে। এটি যেন সঙ্গীতের অলংকারের গহনার মতো—ছোট, কিন্তু অত্যন্ত মূল্যবান। অতিরিক্ত মুর্কি গানকে কৃত্রিম করে তুলতে পারে, তাই এর ব্যবহার পরিমিত হওয়া উচিত। সঠিক মুর্কি শ্রোতার কানে মোলায়েম আনন্দ এনে দেয় এবং গানের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

 

ওস্তাদ আল্লাদিয়া খান
ওস্তাদ আল্লাদিয়া খান

 

শিক্ষাব্যবস্থায় অলঙ্কার

অলঙ্কার কেবল সৌন্দর্য নয় – এটি একটি শিক্ষামূলক ভিত্তি। সংগীত ছাত্রছাত্রীদের জন্য অলঙ্কার অনুশীলন অপরিহার্য। পুরন্দর দাস – আধুনিক কর্ণাটক সংগীতের জনক, ছাত্রদের জন্য অলঙ্কারস্বরাবলী-ভিত্তিক ব্যায়াম চালু করেন। তিনি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তিনটি সপ্তকে (মন্দ্র, মধ্য ও তার) নির্দিষ্ট অলঙ্কার চর্চার মাধ্যমে প্রস্তুত করতেন।

অলঙ্কারের প্রয়োগ

অলঙ্কার প্রযোজ্য—

  • কণ্ঠসংগীতে
  • যন্ত্রসংগীতে
  • রাগবিস্তারে
  • বন্দিশ পরিবেশনায়
  • মান্ধরা ও তান পরিবেশনে

অলঙ্কার ছাড়া সংগীত যেন কঙ্কালসার—আর অলঙ্কার যুক্ত হলে তা হয়ে ওঠে জীবন্ত শিল্প

ওস্তাদ ফাইয়াজ খান, আগ্রা ঘরানা

শাস্ত্রীয় সংগীতে অলঙ্কারের গুরুত্ব

অলঙ্কার—

  • রাগের রূপ ফুটিয়ে তোলে
  • শ্রোতার আবেগ জাগায়
  • শিল্পীর দক্ষতা প্রকাশ করে
  • পরিবেশনার ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে

এ কারণেই বলা হয়—

“যেখানেই অলঙ্কার, সেখানেই সংগীতের প্রাণ।”

অলঙ্কার হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অলক্ষ্য অলংকার—যার ছোঁয়ায় সুর হয়ে ওঠে অনুভবের বাহন। এটি শুধু সাজ নয়, বরং রাগের আত্মা। যে শিল্পী অলঙ্কার বোঝেন, তিনি কেবল গান গাইছেন না—তিনি সুরে গল্প বলছেন। অতএব, অলঙ্কার শুধু একটি ধারণা নয়— এটি সংগীতের নান্দনিক দর্শন