আজও কিভাবে বিটোফেনের ‘মুনলাইট সোনাটা’ হৃদয় মুচড়ে দেয় !

কিছু সঙ্গীত আছে, যারা প্রবল ভঙ্গিতে নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করে—শ্রোতার মনোযোগ দাবি করে নেয়। আবার কিছু সঙ্গীত আছে, যারা অপেক্ষা করে। ধীরে, নিঃশব্দে। যতক্ষণ না শ্রোতা নিজেই এগিয়ে এসে মন দিয়ে শোনার জন্য প্রস্তুত হয়। লুডভিগ ফান বিটোফেনের পিয়ানো সোনাটা নং ১৪, সিশার্প মাইনর-এর প্রথম অংশটি নিঃসন্দেহে এই দ্বিতীয় শ্রেণির। পৃথিবী যাকে ‘মুনলাইট সোনাটা’ নামে চেনে, সেই প্রথম অংশটি কোনো প্রদর্শনী নয়—এ এক চাপা স্বীকারোক্তি, যেন নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলা।

প্রথম মাত্রা থেকেই মনে হয়, সময় যেন থমকে আছে। এই সঙ্গীত এগিয়ে চলে না—ভাসে। বাঁ-হাতে ধীরে দুলতে থাকা একটি ছন্দ বারবার ফিরে আসে, যেন ক্লান্ত অথচ স্থির হৃদস্পন্দন। তার ওপর ডান হাতের সুর এতটাই নরম ও ভঙ্গুর যে, মনে হয় সে বসে না, ভেসে থাকে। এই সঙ্গীত কোনো সমাধানের খোঁজ করে না। সে কেবল মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে টিকে থাকে।

ফিসফিস করে বলা শোক

‘মুনলাইট’ নামটি বিটোফেনের দেয়া নয়। তার মৃত্যুর বহু পরে দেয়া হয়েছিল। এই সঙ্গীত শুনে কেউ একজন কল্পনায় জলের ওপর ঝিলমিল করা চাঁদের আলো থেকে হয়তো নামটি দিয়েছিলেন। ছবিটি সুন্দর, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। এই অংশটি চাঁদের আলো নয়, বরং রাতের কথা বলে—সেই রাত, যখন চিন্তা ভারী হয়ে ওঠে, স্মৃতি তীক্ষ্ণ হয়, আর অনুভূতিগুলো দিনের মুখোশ খুলে ফেলে। এটি এক নিশাচর বিলাপ—সংযত, আত্মসমর্পিত, নিঃশব্দে বিধ্বস্ত।

এই অংশের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক তার সংযম। বিটোফেন নির্দেশ দিয়েছেন পিয়ানিসিমো—প্রায় ফিসফিস করে বাজাতে। সুর যখন গাঢ় হয়, টান যখন বাড়ে, তখনও এই সঙ্গীত আর্তনাদ করে না। এখানকার যন্ত্রণা বাহ্যিক নয়, অন্তর্গত। প্রতিটি অসংগত ধ্বনি যেন দীর্ঘশ্বাস আটকে রাখার মতো, আর প্রতিটি মীমাংসা আসে স্বস্তি নয়, বরং ক্লান্ত স্বীকৃতি নিয়ে।

এই কম্পোজিশন শুনলে বোঝা যায় — সব দুঃখ নাটকীয় হয় না। কিছু শোক কেবল থাকে, অবিচল ও অনিবার্য। পুনরাবৃত্তি এখানে ইচ্ছাকৃত। গভীর রাতে যে চিন্তাগুলো তাড়াতে চাইলেও ফিরে আসে, ঠিক তেমনই সুরটি একই অনুভবের চারপাশে ঘোরে—পালানোর জন্য নয়, আরও গভীরে প্রবেশ করার জন্য।

এই সোনাটাটি রচিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন বিটোফেনের শ্রবণশক্তি হ্রাস আর অস্বীকার করা যাচ্ছিল না। নিঃসঙ্গতা ঘনিয়ে আসছিল। যোগাযোগ—যা ছিল তাঁর প্রাণ—ধীরে ধীরে হাতছাড়া হচ্ছিল। তবু এই সঙ্গীতে রাগ বা বিদ্রোহ নেই। আছে একান্ত সহনশীলতা। এটি নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াই করে না—তার পাশে বসে থাকে।

মুনলাইট সোনাটার প্রথম অংশ শোনা মানে প্রথমে তার গঠন বা কৌশল বিশ্লেষণ করা নয়। বরং তার স্থিরতা অনুভব করার অনুমতি নিজেকে দেওয়া। গভীর রাতে শোনো। নীরবতাগুলোকে গুরুত্ব দাও। লক্ষ করো, কীভাবে সময় দীর্ঘ হয়ে আসে, কীভাবে নোটের ফাঁকে ফাঁকে সঙ্গীত শ্বাস নেয়।

এই সঙ্গীত আপনাকে মুগ্ধ করতে চায় না। সে আপনাকে চিনে নেয়। আর একবার চিনে নিলে, শেষ সুর মিলিয়ে যাওয়ার বহু পরেও সে থেকে যায়।

কোন এক রাতে কাবি ফায়াজ আহমদ ফায়াজের তানহায়ি কবিতাটি পড়ুন – ফির কোই আয়া দিল-এ-জার, নহিঁ কোই নহিঁ ….। অনুভব করুন। এরপর সোনাটাটি শুনুন। ওহ হ্যা এরপর শুনতে পারেন Piano Sonata No. 32 in C minor, Op. 111.