কদিন কৃষ্ণচন্দ্র দে এসে হাজির হলেন এক ছিপছিপে তরুণকে নিয়ে। সকলে বলত—ছেলেটি নাকি বড় গায়, অথচ কেউ তার জন্য গান লিখতে রাজি নয়। হেমেন্দ্রকুমার রায় গান শুনলেন। মুগ্ধ হলেন, এবং তৎক্ষণাৎ লিখতে সম্মত হলেন।
চণ্ডীচরণ সাহার নতুন রেকর্ড কোম্পানি হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস থেকে বেরোল ছেলেটির প্রথম রেকর্ড—
“ডাকলে কোকিল রোজ বিহানে”
গীতিকারের কলমে হেমেন্দ্রকুমার, সুর নিজের।
ছেলেটির নাম—শচীন দেববর্মন।
Table of Contents
হিন্দি সিনেমায় প্রথম বিপত্তি
হিন্দি ছবিতে গান গাইতে গিয়েই বাধা। ইয়াহুদি কি লড়কি–র সব গান রেকর্ড হওয়ার পর সুরকার ঘোষণা করলেন—
“এই গলা চলবে না।”
বর্মন সাহেব বাদ।
হতাশ হয়ে ভাবলেন—এবার সুরকার হবেন। কিন্তু গায়ক মিলছে না। কেউ তাঁর সুরে গান গাইতে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত সামসেদ বেগমের হাত-পা ধরলেন।
প্রযোজক শর্ত দিলেন—সামসেদ গাইলেই গান নেবেন, মনে মনে নিশ্চিত—তিনি ঠিক ফিরিয়ে দেবেন।
কিন্তু সামসেদ রাজি হলেন। গাইলেন—
“কুছ রঙ বদল রহি হ্যায়।”
কে জানত, কয়েক বছর পর এই তরুণ সুরকারের সুরে সামসেদের গাওয়া “সাইয়া দিল মে আনা রে” তাঁরই সিগনেচার গান হয়ে উঠবে!
নতুনদের প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসা
কত নতুন শিল্পীকে সুযোগ দিয়েছেন শচীন কর্তা, তার হিসেব রাখা দুষ্কর। কিশোর কুমারের গল্প আমরা জানি।
তরুণ কাইফি আজমির মধ্যেও কী দেখেছিলেন কে জানে! গুরু দত্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সিনেমা কাগজ কে ফুল তৈরি করছেন। ছবির এক গুরুগম্ভীর দৃশ্য এগোবে শুধু একটি গানে। শচীন কর্তা দায়িত্ব দিলেন একেবারে আনকোরা কাইফিকে।
আর সেই গান—
“ওয়াক্ত নে কিয়া কেয়া হাসিন সিতম”
গীতা দত্তের কণ্ঠে, স্পটলাইটে পর্দার নীরবতাকে ছাপিয়ে আজও ভারতীয় সিনেমার কাল্ট-গানের তালিকায় অমর।
জীবনের শেষ দিকে কাইফি আজমি নিজেও বলেছিলেন—
“এই একটি গানই আমাকে সারাজীবন গর্বিত রাখবে।”
‘মিলি’–র রেকর্ডিং ও শচীন কত্তার শেষ দিনগুলো
দিনটি মিলি সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ের। শচীন কর্তার শরীর অত্যন্ত খারাপ। তবু কাজ ফেলে রাখা যাবে না—ছেলে রাহুল (পঞ্চম) তত্ত্বাবধানে তাঁর সুরে গান রেকর্ড হচ্ছে।
কিশোর কুমার গাইলেন—
“বড়ি শুনি শুনি হ্যায় / জিন্দেগী ইয়ে জিন্দেগী।”
গান না কান্না—বোঝা মুশকিল। তার বেদনায় স্টুডিওতে সবার চোখ ভিজেছিল। রাহুলেরও।
বাবা–ছেলের অভিমান
কিছুদিন আগেই গভীর অভিমান করেছিলেন বাবা।
স্টুডিওতে রাহুল ‘দম মারো দম’ তোলাচ্ছিলেন আশাজিকে। শচীন কর্তা শুনে রাগে মুখ লাল।
তিনি চেঁচিয়ে বললেন—
“আমি এই গান তরে শিখাইছি? মাঠের গান ভুইল্যা, বাংলার গান ভুইল্যা, অবিকল বিদেশি সুর নকল করস! তুই আমার কুলাঙ্গার ছেলে!”
কর্তা মাথা নত করে বেরিয়ে গেলেন। সবার মনে হল—যেন এক রাজা যুদ্ধে হেরে ফিরছেন।
শেষ বাক্য : “ইস্টবেঙ্গল জিতসে”
মিলির রেকর্ডিং সেরে বাড়ি ফিরতেই রাহুল দেখলেন, বাবার শেষ সময়। শচীন কর্তা প্রায় অচেতন।
ছেলের কানে রাহুল ধীরে ফিসফিস করে বললেন—
“ইস্টবেঙ্গল ৫–০ তে জিতেছে।”
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। ধীরে চোখ খুললেন। অস্ফুট কণ্ঠে বললেন—
“ইস্টবেঙ্গল জিতসে…”
সেই ছিল তাঁর শেষ কথা।
