উস্তাদ হাফিজ আলি খান সাহেবর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে উস্তাদ হাফিজ আলি খান সাহেব এক অনন্য নাম—সরোদের ভাষাকে যিনি দিয়েছেন কণ্ঠের মতো আবেগ, দীপ্ত স্বচ্ছতা এবং রাজসিক মর্যাদা। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে সঙ্গীত গুরুকুল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে এই কিংবদন্তি শিল্পীকে, যাঁর সাধনা ও উত্তরাধিকার আজও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

বংশপরম্পরা ও সংগীতভিত্তি

উস্তাদ হাফিজ আলি খান ছিলেন সরোদের বাঙ্গেশ (গোয়ালিয়র ঘরানা)-র পঞ্চম প্রজন্মের উত্তরসূরি—একটি পরম্পরা, যার শিকড় সেনিয়া ধারার গভীরে প্রোথিত। তাঁর পিতা নান্নেহ খান নিজেও ছিলেন একজন খ্যাতিমান সরোদবাদক। স্বাভাবিকভাবেই শৈশব থেকেই হাফিজ আলি খান বেড়ে ওঠেন সংগীতের আবহে এবং প্রাথমিক তালিম নেন পিতার কাছেই।

পরবর্তীকালে তিনি সংগীতশিক্ষা গ্রহণ করেন একাধিক বিশিষ্ট গুরুর কাছে—

  • তাঁর জ্ঞাতিভাই আবদুল্লা খান,
  • ভ্রাতুষ্পুত্র মোহাম্মদ আমির খান,
  • এবং সর্বোপরি রামপুরের বিনকার উস্তাদ ওয়াজির খান-এর কাছে।

উস্তাদ ওয়াজির খানকে তানসেনের কন্যার বংশধর বলে মনে করা হয়। একই সময়ে মাইহার ঘরানার প্রবাদপ্রতিম উস্তাদ আলাউদ্দিন খান-ও ওয়াজির খানের শিষ্য ছিলেন—এটি হাফিজ আলি খানের সংগীতভিত্তির গভীরতা ও ঐতিহ্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

এছাড়া তিনি মথুরায় গণেশীলাল চৌবে-র কাছে ধ্রুপদ এবং ভাইয়া গণপতরাও-এর কাছে ঠুমরির তালিম নেন। এর ফলে তাঁর বাজনায় ধ্রুপদের গাম্ভীর্য ও ঠুমরির আবেগী মাধুর্য—দুয়েরই এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়।

সংগীতধারা ও নান্দনিকতা

উস্তাদ হাফিজ আলি খান সাহেব বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন তাঁর সরোদের স্বচ্ছ ও ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার স্ট্রোক, দীর্ঘ মীন্ড, সংযত গামক এবং গীতল ভঙ্গির জন্য। তাঁর বাজনায় এক অনির্বচনীয় কণ্ঠস্বরের অনুভব পাওয়া যায়। অনেক সমালোচকের মতে, তাঁর কল্পনাশক্তি অনেক সময় কঠোর ধ্রুপদী কাঠামোর চেয়ে অর্ধ-শাস্ত্রীয় ঠুমরি ধারার কাছাকাছি চলে যেত—কিন্তু সেটিই তাঁর স্বাতন্ত্র্য, তাঁর মানবিক সুরভাষা।

কর্মজীবন ও রাজসিক উপস্থিতি

হাফিজ আলি খানের রাজসিক চেহারা, মঞ্চে উপস্থিতি এবং ব্যক্তিত্ব তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় শিল্পীতে পরিণত করেছিল—বিশেষত এমন এক যুগে, যখন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কণ্ঠসঙ্গীতই ছিল প্রাধান্যশীল। তবুও একজন যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

গোয়ালিয়রের দরবারি সংগীতজ্ঞ থাকাকালীন তিনি নিয়মিত বাংলায় যাতায়াত করতেন এবং বড় বড় সংগীত সম্মেলনে পরিবেশন করতেন। বাংলার দুই বিশিষ্ট সংগীতানুরাগী ও অভিজাত—রায়চাঁদ বোরালমনমথ ঘোষ—তাঁর সংগীতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে তালিমও নেন।

ঔপনিবেশিক ভারতের ভাইসরয়াল মহলেও তিনি সমাদৃত হন—বিশেষ করে সরোদের উপর তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিতে পরিবেশিত “God Save the King” সুরের জন্য।

স্বীকৃতি ও সম্মান

উস্তাদ হাফিজ আলি খানের সংগীতসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ১৯৬০ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে—যা তাঁর শিল্পীজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

উত্তরাধিকার ও স্মরণ

১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে, ৮৪ বছর বয়সে, তিনি নয়াদিল্লিতে পরলোকগমন করেন। তাঁর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে দিল্লির নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনের নিকটে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় “Hafiz Ali Khan Road”। ২০১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী শীলা দীক্ষিত এই রাস্তার উদ্বোধন করেন। রাজধানী শহরে তানসেন ও ত্যাগরাজের পর কোনো শিল্পীর নামে নামকরণ হওয়া এটি অন্যতম বিরল দৃষ্টান্ত।

তবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার রয়ে গেছে তাঁর পরিবার ও শিষ্যপরম্পরায়—বিশেষ করে তাঁর পুত্র উস্তাদ আমজাদ আলি খান, যাঁর মাধ্যমে সরোদের এই মহান ধারাটি বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

উস্তাদ হাফিজ আলি খান সাহেব কেবল একজন সরোদবাদক নন—তিনি ছিলেন এক দর্শন, এক মূল্যবোধ। তাঁর সংগীতে ছিল সংযম, আভিজাত্য এবং মানবিক আবেগের গভীর প্রকাশ। তাঁর প্রয়াণে একটি যুগের অবসান হলেও, তাঁর সৃষ্ট সুর আজও সরোদের তারে, রাগের অলিগলিতে এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চেতনায় চিরজাগরুক।