১৭ নভেম্বর দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতাঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল, প্রিয় ও প্রভাবশালী কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার জন্মদিন। তাঁর অনন্য কণ্ঠ, শক্তিশালী উপস্থাপন ও আবেগঘন পরিবেশনা বহু প্রজন্ম, ভাষা এবং সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়জুড়ে তিনি যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সৃষ্টি করেছেন, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর জন্ম নেওয়া রুনা লায়লা শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। প্রথমে শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেও পরে তিনি নানা ধরনের গান পরিবেশনায় দক্ষতা অর্জন করেন—প্লেব্যাক, গজল, পপ, বাংলা আধুনিক থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশীয় ফিউশন সংগীতেও তিনি সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তাঁর কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা, আবেগপ্রবণতা এবং সুর–তাল–অভিব্যক্তির নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করেছে।
রুনা লায়লার জনপ্রিয়তা দ্রুতই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পাকিস্তান, ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। উর্দু চলচ্চিত্রে গাওয়া গান তাঁকে উপমহাদেশব্যাপী পরিচিত করে তোলে, আর বাংলা গানে তার অবদান তাকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করেছে। ঢাকার স্টুডিও, করাচির চলচ্চিত্রশিল্প বা মুম্বাইয়ের সংগীত অঙ্গন—সব জায়গায়ই তাঁর কণ্ঠ সমানভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছে।
শাস্ত্রীয় ঘরানার অনুপ্রাণিত সুর থেকে শুরু করে আধুনিক ছন্দময় গানে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাকে বাংলা ও দক্ষিণ এশীয় সংগীতের আন্তর্জাতিক দূতে পরিণত করে। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক বিশেষ আবহ—একদিকে দৃঢ়তা, অন্যদিকে কোমলতা। প্রেম, আনন্দ, বিষাদ কিংবা উচ্ছ্বাস—সব অনুভূতিই তিনি সহজাত স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন।
‘দমাদম মস্ত কালন্দর’, ‘ও আমার জীবনসাথী’সহ তাঁর অসংখ্য গান আজও কোটি মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তিনি শুধু সংগীতপট পরিবর্তন করেননি, বরং নারীদের জন্যও শিল্পীজগতের নতুন পথ তৈরি করেছেন—সম্মান, আত্মবিশ্বাস ও নন্দনচেতনায়।
রুনা লায়লা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সেই ভালোবাসা, যা অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে তার কণ্ঠ রেখে গেছে। তাঁর গান আজও নতুন প্রজন্ম শেখে, গায়, মনে রাখে।
তার জন্মদিনে আমরা তাঁকে সম্মান জানাই—
এক যুগের কণ্ঠ,
এক অগ্রদূত,
এক সাংস্কৃতিক প্রতীক,
এবং সর্বোপরি—
এক অনন্ত শিল্পী, যার সংগীত কখনও ম্লান হবে না।
রুনা লায়লা শুধু গান করেননি—তিনি পুরো জাতির অনুভূতিকে কণ্ঠ দিয়েছেন।
