বিশ্বব্যাপী পপ সংস্কৃতি ও সংগীত জগতের রূপান্তরকারী মাধ্যম হিসেবে পরিচিত মিউজিক টেলিভিশন বা এমটিভির চার দশকের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবার সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হতে যাচ্ছে। গত ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সংগীত নির্ভর সম্প্রচার চিরতরে বন্ধ করার মাধ্যমে সুরের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায় এই প্রতিষ্ঠানটি। এমটিভির সেই শুরু থেকে বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বিস্তারের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বখ্যাত প্রযোজনা সংস্থা নিওন।
চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট ও নির্মাণশৈলী
সংগীত ও জীবনশৈলী ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডেডলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রেইগ মার্কস ও রব টেনেনবাউম রচিত ‘আই ওয়ান্ট মাই এমটিভি: আনসেনসরড স্টোরি অফ দ্য মিউজিক ভিডিও রেভোলিউশন’ নামক জনপ্রিয় বইটির ওপর ভিত্তি করে এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হচ্ছে। এটি পরিচালনা করবেন জেরেমি জ্যাসপার, যিনি ইতিপূর্বে ‘শর্টবাস’, ‘প্যাটি কেকস’ এবং ‘ওডেসা’র মতো সমালোচক মহলে প্রশংসিত ও ব্যবসায়িকভাবে সফল চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন।
সিনেমাটিতে মূলত গত শতাব্দীর আশির দশকের সেই স্বপ্নদ্রষ্টাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হবে, যারা বিশ্বাস করেছিলেন যে সংগীত এবং টেলিভিশনের মেলবন্ধনের মাধ্যমেই ভবিষ্যতের বিনোদন জগৎ নিয়ন্ত্রিত হবে। একটি সাধারণ সংগীত চ্যানেল থেকে কীভাবে এটি বিশ্বব্যাপী পপ সংস্কৃতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠল, সেই বিবর্তনই হবে এই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য।
এমটিভির ঐতিহাসিক মাইলফলকসমূহ
১৯৮১ সালের ১ অগাস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমটিভির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর সূচনা ছিল অত্যন্ত নাটকীয়; ‘দ্য বাগলস’ ব্যান্ডের ‘ভিডিও কিলড দ্য রেডিও স্টার’ গানটি প্রচারের মাধ্যমে এটি সম্প্রচার শুরু করে। নিচে এমটিভির ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| সাল/তারিখ | ঐতিহাসিক ঘটনা ও অর্জন |
| ১ অগাস্ট, ১৯৮১ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সম্প্রচার শুরু। |
| ১০ মার্চ, ১৯৮৩ | মাইকেল জ্যাকসনের ‘বিলি জিন’ প্রচারের মাধ্যমে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীর গান অন্তর্ভুক্তকরণ। |
| আশির দশকের শেষভাগ | ১৭০টিরও বেশি দেশে ২৫টি ভাষায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ। |
| নব্বইয়ের দশক | জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ‘ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস’ ও ‘আনপ্লাগড’ এর মতো কালজয়ী অনুষ্ঠান নির্মাণ। |
| ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ | দীর্ঘ ৪৪ বছরের সংগীত প্রচারের যাত্রার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। |
সাংস্কৃতিক প্রভাব ও সমাপ্তি
এমটিভি কেবল গান প্রচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি মিউজিক ভিডিওর একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। সময়ের সাথে সাথে এটি লাইফস্টাইল চ্যানেল এবং শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চ্যানেলসহ প্রায় ২০০টি চ্যানেলের এক বিশাল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। তাদের বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন ‘এমটিভি গ্রাইন্ড’ এবং সরাসরি সংগীত পরিবেশনার অনুষ্ঠান ‘এমটিভি আনপ্লাগড’ বিশ্বজুড়ে দর্শকপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
পরিহাসের বিষয় এই যে, ১৯৮১ সালে যে গানটি দিয়ে এমটিভি তাদের যাত্রা শুরু করেছিল, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সেই একই গান ‘ভিডিও কিলড দ্য রেডিও স্টার’ প্রচারের মাধ্যমেই তারা তাদের সুরের ভুবনের দরজা বন্ধ করে দেয়। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শক এমটিভির সেই স্বর্ণালী সময় এবং একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পেছনের অজানা গল্পগুলো নতুন করে জানার সুযোগ পাবেন। প্রযোজনা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংগীতপ্রেমী এবং চলচ্চিত্রের অনুরাগীদের জন্য এটি একটি বিশেষ উপহার হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে সিনেমাটির প্রাক-নির্মাণ কাজ চলছে এবং দ্রুতই চিত্রধারণের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
