বাংলা শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে ওস্তাদ মুন্সী রইসউদ্দিন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত। তাঁর সংগীত সাধনা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং রচনাকর্ম এ অঞ্চলের শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ১৯৮৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন, যা তাঁর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
১৯০১ সালের ১০ জানুয়ারি মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কিন্তু আর্থিকভাবে সীমিত পরিবারের মধ্যে তাঁর জন্ম হয়। শৈশবকাল থেকেই তিনি সংগীতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। প্রাথমিক সংগীত শিক্ষা তিনি পারিবারিকভাবে প্রাপ্ত এক আত্মীয়ের কাছ থেকে গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগীত শিক্ষার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।
মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি জীবিকার প্রয়োজনে কলকাতায় যান। সেখানে তিনি কর্মজীবনের পাশাপাশি সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন। দীর্ঘ বারো বছর তিনি রাসবিহারী মল্লিকের নিকট ধ্রুপদ ও খেয়াল ধারার গভীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চাঙ্গ সংগীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন এবং লক্ষ্ণৌর শরজিৎ কাঞ্জিলালের নিকট থেকেও সংগীতচর্চায় দীক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৩৮ সালে কলকাতাভিত্তিক বেতার সম্প্রচারে তাঁর কণ্ঠ প্রথম প্রচারিত হয়। এই সময় থেকে তিনি সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় এসে বেতার শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন এবং নারায়ণগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি সংগীত শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ‘প্রবেশিকা সংগীত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান বহু শিক্ষার্থীকে শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষিত করে তুলতে ভূমিকা রাখে। ১৯৫৫ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৪ সালে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাঁর নেতৃত্বে সংগীত শিক্ষার কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটে এবং শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চা নতুন মাত্রা পায়। তিনি শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, বরং সংগীত বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক রচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সরল সংগীত, সারসংগ্রহ, ছোটদের সারেগামা, অভিনব শতরাগ, সংগীত পরিচয়, রাগ লহরী এবং গীত লহরী। এসব গ্রন্থ শিক্ষার্থীদের সংগীত শিক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তিনি নতুন রাগ-রাগিণী সৃষ্টির মাধ্যমেও সংগীত ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন। গবেষণাধর্মী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেন।
১৯৭৩ সালের ১১ এপ্রিল তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর জীবন ও কর্ম পরবর্তী প্রজন্মের সংগীতচর্চায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
জীবনপঞ্জি সংক্ষিপ্ত সারণি
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯০১ | মাগুরার নাকোল গ্রামে জন্ম |
| ১৯১৮ | জীবিকার জন্য কলকাতা গমন |
| ১৯৩৮ | বেতার সম্প্রচারে সংগীত পরিবেশনা শুরু |
| ১৯৪৭ | ঢাকায় আগমন ও বেতার শিল্পী হিসেবে যোগদান |
| ১৯৫৫ | বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে সহ-অধ্যক্ষ |
| ১৯৬৪ | একাডেমির অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহণ |
| ১৯৮৬ | মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান |
| ১৯৭৩ | মৃত্যুবরণ |
