কছিম উদ্দিন । বাঙালী লোকসংগীত শিল্পী

কছিম উদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত ভাওয়াইয়া গানের একজন অন্যতম প্রধান শিল্পী। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের পর তাকেই ভাওয়াইয়া গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং ‘ভাওয়াইয়া গানের যুবরাজ’ বলে বিবেচিত হন।

জন্ম স্থান ও জীবনী

১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মার্চ, বাংলাদেশের বর্তমান লালমনির হাট জেলার তিস্তা নামক রেলওয়ে স্টেশনের নিকটবর্তী ―তিস্তা নদীর পাড়ের রতিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ছমির উদ্দিন। মায়ের নাম কছিরন নেছা । উল্লেখ্য, তার একমাত্র আপন বড় বোনের নাম ছিল ছবিরন নেছা। ছোট বেলায় কেউ কেউ তাকে ‘ভাকা’ নামে ডাকতো।  তার গায়ের রঙ কালো ছিল বলে—কেউ কেউ তাকে ‘কালু’ বলেও ডাকতো। পরে ডা. মতিয়ার রহমানের (জনৈক স্থানীয় চিকিৎসক) স্ত্রী জহুরা খাতুন তার (কছিম উদ্দীনের মায়ের নামানুসারে) নাম রাখেন কছিম উদ্দিন।

স্কুলে পাঠ শেষ না করেই কছিম উদ্দিন গ্রাম্য পালা গানের দল— ‘আজো গীদালের দল’-এ দোয়ারি (কৌতুক অভিনেতা) হিসেবে যোগ দেন এবং অতি অল্প সময়ের ভিতর তিনি সুনাম অর্জন করেন। এই দলে দোয়ারিপনার ভিতর দিয়ে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করেন।

এই সূত্রে সে সময়ের প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী নগেনচন্দ্র কুশানী তাকে তার দলে যোগ দেয়ার জন্যে অনুরোধ করেন। এই দলে থাকার সময় তিনি নগেনচন্দ্রের ভাই-ঝি শ্যামলিনী দেবী’র (বিমলা) প্রেমে পড়েন। পরে এই কারণেই তাকে ঐ দল ত্যাগ করতে হয়। এরপর তিনি স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত রজনীকান্তের দলে যোগ দেন।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে তিনি রংপুরে আনসার বাহিনীতে যোগদান করে প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুড়িগ্রাম শহরে এসে কিছুদিন আনসার প্রশিক্ষক ও সঙ্গীত শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন তিস্তায় আসেন। এই উপলক্ষে আববাস উদ্দিনও গান গাওয়ার জন্য তিস্তায় আসেন। এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনুরোধে যুবক কছিম উদ্দিন গান গাওয়ার অনুমতি পান।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জুলাই তিনি প্রথম রেডিওতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। উল্লেখ্য, এই সময় ঢাকা বেতার কেন্দ্র ছিল নাজিম উদ্দিন রোডে। এরপর থেকে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ঢাকা বেতারে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সে সময় বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে শিল্পী সাহিত্যিক সমাবেশে তিনি নিয়মিত যোগদান করতেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি গান লিখতে শুরু করেন। এই বৎসরের নির্বাচনে মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় গান গেয়ে ‘কোকিল কণ্ঠী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৫৭/৫৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে হোলখানা ইউনিয়নের ধরলার ওপারে অবস্থিত বড়াইবাড়ী চড়ের আছমত উল্লাহ ব্যাপরির জ্যেষ্ঠ কন্যা গোলাফুন নেছা’র সাথে তার বিয়ে হয়।

১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পরপর দুটিসাইক্লোন হয়। এই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থদের সাহায্যের জন্য তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে ‘ভিক্ষে দাও হে পুরবাসী’ গানটি গেয়ে দোকানে দোকানে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।

১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে পাক-ভারত যুদ্ধে মুজাহিদ বাহিনীর উদ্দেশ্যে নিজের লেখা ‘সাবাস মুজাহিদ ভাইয়ারে’ এবং ‘আমরা আজাদ আমরা বীর, জিন্দা মোদের উচ্চ শির, কাজ করে যাই জেন্দেগীর, মানি না ভাই ঝড় তুফান’ গানগুলি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছেন।

১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি নিজের লেখা গান গাইতে শুরু করেন। উল্লেখ্য, ওই বৎসরেই তিনি বেতারকেন্দ্রের গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘হিজ মাষ্টারস ভয়েজ’ কোম্পানীতে প্রথম নিজের লেখা গান তার কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। এ ব্যাপারে পল্লী কবি জসিম উদ্দিন তাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। পরবর্তীতে রূপবান খ্যাত সিনেমা পরিচালক সালাউদ্দিন সাহেবের গ্রামোফোন কোম্পানীতে তার অনেকগুলো গান রেকর্ড করা হয়। এই সময় তিনি ২৪টি নিজের লেখা গান রেকর্ড করেন। তার সাথে সহযোগী শিল্পীরা ছিলেন দোতরা-বাদক নমরুদ্দিন, রওনোক আরা রাসেল। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি টেলিভিশনে ভাওয়াইয়া গান নিয়মিতভাবে পরিবেশন করেছেন।

১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে, রাজশাহী বেতার কেন্দ্র থেকে রংপুর বেতার কেন্দ্রে আসেন এবং এই বেতারকেন্দ্রে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গান পরিবেশন করেছেন।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকের অসহযোগ আন্দোলনের সময় রংপুর শহরে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভবনে জাতীয় লোকসঙ্গীত সম্মেলনে কছিম উদ্দিন অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান শেষে বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে লেখা ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর ভাই’- গানটি পড়ে বঙ্গবন্ধু কছিম উদ্দীনের ডায়রীতে অটোগ্রাফ দেন।

কর্মজীবন

শিল্পী কছির উদ্দিন মহান মুক্তিযুদ্ধ কালীন বিভিন্ন ক্যাম্পে ভাওয়াইয়া গান গেয়ে সাধারণ জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে ভাওয়াইয়া গানের পাশাপাশি পালাগানও পরিবেশন করতেন।

মৃত্যু

কছিম উদ্দিন ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট ভোরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, তার নিজ বাড়ীতে মৃত্যুবরণ করেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

প্রতি বছর ২২ আগস্ট কুড়িগ্রাম জেলায় তার সম্রণে ‘কছিম উদ্দিন উৎসব’ পালন করা হয়; যেখানে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহযোগিতায় কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শিল্পীদের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, ভাওয়াইয়া কথন ও গান, কছিম উদ্দিনের গানে সঙ্গে নৃত্যানুষ্ঠান, পালাগান এবং কছিম উদ্দিনের লেখা ও গাওয়া ভাওয়াইয়া গানের পরিবেশনাসহ নানা আয়োজন যুক্ত থাকে। এছাড়াও দিবসটি উপলক্স্যে বাংলাদেশ বেতারের রংপুর কেন্দ্র এবং চিলমারী রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে।

Leave a Comment