বাংলা লোকসঙ্গীতের এক প্রাণবন্ত ও জনপ্রিয় ধারার নাম কবিগান। এটি কেবল একটি গীত-প্রতিযোগিতা নয়, বরং বাংলা সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম ও রসিকতার বহিঃপ্রকাশ। কবিগানকে বাংলার গ্রামীণ জনজীবনের মঞ্চভিত্তিক সংগীত-সাহিত্য বলা চলে। এখানে কবি মানে প্রচলিত অর্থে সাহিত্যিক কবি নয়; বরং অশিক্ষিত কিন্তু বুদ্ধিমান, তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও সমাজসচেতন একজন লোককবি—যাকে বলা হয় কবিয়াল।
কবিগান হল বাংলার মৌখিক সাহিত্যের নাটকীয় সংগীতধারা, যার মাধ্যমে কবিরা তৎকালীন সমাজের নানা প্রশ্ন, ধর্ম, রাজনীতি, প্রেম ও ব্যঙ্গকে গানে গানে ব্যক্ত করতেন।
Table of Contents
কবিগান ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
কবিগানের উদ্ভব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলায় কবিগানের সূত্রপাত প্রায় আঠারো শতকের মধ্যভাগে, বিশেষত পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)-এর পরবর্তী সময়ে। এই সময়ে বাংলা সমাজে এক গভীর পরিবর্তন ঘটে—
নবাবি আমলের অবসান, ইংরেজ শাসনের সূচনা এবং পুরনো রাজসভা সংস্কৃতির ভাঙন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সামাজিক পরিবর্তনকেই কবিগানের জন্মভূমি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেন—
“ইংরেজের নতুন সৃষ্ট রাজধানীতে পুরাতন রাজসভা ছিল না।
পুরাতন আদর্শ ছিল না। তখন কবির আশ্রয়দাতা রাজা হইল সর্বসাধারণ নামক এক অপরিণত স্থলায়তন।
সেই হঠাৎ রাজার সভায় উপযুক্ত গান হইল কবিদলের গান।”
অর্থাৎ, রাজসভা বিলুপ্ত হলেও নতুন শহর কলকাতার মধ্যবিত্ত শ্রোতাসমাজ কবিদের নতুন পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিল। তারা সাহিত্যের সূক্ষ্ম রস না বুঝলেও উত্তেজনাপূর্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত ও তর্কনির্ভর গান উপভোগ করত। এই জনরুচিই কবিগানের জন্ম দেয়।
কবিয়াল : জনমানুষের কবি
কবিয়াল শব্দের অর্থ “কবিগান পরিবেশক বা কবি-গায়ক”।
তারা ছিলেন মৌখিক সাহিত্যিক, যারা লিখিত কবিতা নয়, মুখে মুখে তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনা ও পরিবেশন করতেন।
তাঁরা ছিলেন সমাজচেতনার ধারক ও লোকবুদ্ধির প্রতীক।
একজন কবিয়াল হতে হলে চাই—
অসাধারণ স্মৃতিশক্তি,
রসিকতা ও যুক্তিতর্কে দক্ষতা,
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও শব্দখেলার পারদর্শিতা,
এবং গীতিকৌশল।
তাঁরা প্রায়ই মুখোমুখি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন—একজন প্রশ্ন করলে, অন্যজন তাৎক্ষণিক উত্তর দিতেন। এই বিতর্কধর্মী সঙ্গীতপ্রতিযোগিতা ছিল কবিগানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কবিগানের গঠন ও রূপ
কবিগান সাধারণত দলগতভাবে পরিবেশিত হত। প্রতিটি দলে থাকত একজন কবিয়াল (প্রধান কবি), একজন দোহার (সহকারী গায়ক), এবং কিছুসংখ্যক বাদ্যযন্ত্রী।
গানের মূল কাঠামোটি ছিল তিন ভাগে—
বন্ধনা – কোনো দেবতার প্রতি প্রার্থনা বা শ্রদ্ধার্ঘ্য, সাধারণত সরস্বতী বা গঙ্গার উদ্দেশে।
আখড়াই – দুই কবিয়ালের মধ্যে মূল বিতর্ক বা গানযুদ্ধ।
পরিসমাপ্তি বা বরাত – ঈশ্বর ও শ্রোতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।
এই গানের ধরনটি ছিল নাটকীয়, প্রাণবন্ত ও শ্রোতাদের অংশগ্রহণে পূর্ণ। বিতর্ক, ব্যঙ্গ, উপমা, অনুপ্রাস, তর্ক ও যুক্তি—সব মিলিয়ে এটি ছিল লোকবুদ্ধির উৎসব।
কবিগান ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সম্পর্ক
যদিও কবিগান মূলত লোকসঙ্গীতধর্মী, তবুও এর সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অল্প কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সংযোগ রয়েছে।
সজনীকান্ত দাস যথার্থই বলেছেন—
“বিভিন্ন সময়ে প্রচলিত ভরজা, পাঁচালী, খেউড়, আখড়াই, হাফ-আখড়াই, দাঁড়া-কবিগান, বসাক-কবিগান, চপ-কীর্তন, টপ্পা, কৃষ্ণযাত্রা প্রভৃতি নানা বস্তুর সংমিশ্রণে কবিগান জন্মলাভ করে, তাতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যবহার এতটা নান্দনিক নয়।”
অর্থাৎ, কবিগান সরাসরি শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারা নয়, বরং তার লোকরূপী রূপান্তর। তবুও এতে মাঝে মাঝে রাগের প্রভাব দেখা যায়, যেমন ভৈরবী, কাহারবা, দাদরা বা খাম্বাজ রাগে কিছু গানের ধ্বনি রচিত হয়।
তবে কবিগানের প্রধান শক্তি ছিল ছন্দ, অনুপ্রাস, তাৎক্ষণিকতা ও নাটকীয়তা— যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জটিল রূপকে না মেনে শ্রোতার আবেগকে সরাসরি স্পর্শ করত।
বিশিষ্ট কবিয়াল ও তাঁদের অবদান
রাম বসু ছিলেন কবিগানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিয়াল।
তাঁকে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত অভিহিত করেছিলেন—
“কবিয়ালদের কালিদাস।”
রাম বসুর গান বাঙালি সমাজে এতই জনপ্রিয় ছিল যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর গান গাইতেন। রবীন্দ্রনাথের “মনে রইল সই মনের কথা” গানটি রাম বসুর মূল গান—
“মনে রইল সই মনের কথা, রাম বসু রয়চিতা”—
থেকে প্রভাবিত।
এর পাশাপাশি আরও বহু খ্যাতনামা কবিয়াল ছিলেন—
ভোলা মোইর, নিত্যানন্দ ভট্টাচার্য, হরিবল্লভ, নন্দলাল, ভজহরি প্রমুখ।
তাঁদের কবিগান শুধু বিনোদন নয়, বরং সমাজ-রাজনীতি, ধর্ম, নৈতিকতা এবং ন্যায়বোধের প্রতিফলন ছিল।
কবিগান : সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্য
কবিগান ছিল জনমানসের আয়না।
অশিক্ষিত শ্রোতাদের কাছে এটি যেমন বিনোদনের মাধ্যম ছিল, তেমনি ছিল শিক্ষারও হাতিয়ার।
এতে ফুটে উঠেছে—
সামন্ততান্ত্রিক সমাজের পতন,
বণিক শ্রেণির উত্থান,
ধর্মীয় আচার ও কুসংস্কারের সমালোচনা,
নারীপুরুষের প্রেম ও সামাজিক টানাপোড়েন।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে কবিগানকে চিত্রিত করেছেন বাংলার সমাজচেতনার এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে।
তাঁর মতে, কবিগান হল—
“বাঙালির লোকপ্রাণের মূর্ত প্রতিধ্বনি।”
ভাষা, রস ও নান্দনিকতা
কবিগানের ভাষা ছিল সরল, দেশজ, কথ্যভাষানির্ভর। কাব্যিক বিশুদ্ধতা বা সাহিত্যিক পরিশীলন এখানে মুখ্য নয়; বরং মুখের রস, যুক্তি ও হাস্যরসই ছিল প্রধান। তবুও কবিগানে এক বিশেষ আবেগময়তা ও নান্দনিক সংগীতরস ছিল যা শ্রোতাকে আকর্ষণ করত। গানে ব্যবহৃত হতো দোহা, ছন্দ, টপ্পা, কীর্তনের আঙ্গিক, এমনকি নাট্যভঙ্গিও।
কবিগানের অবক্ষয় ও উত্তরাধিকার
ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে শহুরে সংস্কৃতি ও আধুনিক থিয়েটারের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কবিগানের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পায়।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর (১৮৫৯) পর এই ধারার কাব্যিক শুদ্ধতা কমতে থাকে, এবং তা ধীরে ধীরে লোকজ বিনোদনে সীমাবদ্ধ হয়।
তবে কবিগানের প্রভাব মুছে যায়নি—
এর ছন্দ, ব্যঙ্গ ও তর্কপ্রবণতা আজও দেখা যায় বাউল, পালাগান, হাফ-আখড়াই, আধুনিক টক-শো বা ব্যাটেল র্যাপ সংস্কৃতিতেও!
কবিগান ছিল বাংলার জনমানসের কণ্ঠস্বর—যেখানে গানের ছন্দে সমাজ, রাজনীতি ও মানবজীবনের গল্প বোনা হয়েছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামো অনুসরণ না করেও এটি বাংলা সংগীতের এক অনন্য শৈল্পিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিল। কবিয়ালরা ছিলেন বাংলার লোকবুদ্ধির দার্শনিক ও সমাজসমালোচক—যারা হাস্য, যুক্তি ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বাঙালিকে নিজের সমাজ ও জীবনকে চিনতে শিখিয়েছিলেন।
তাই কবিগান কেবল এক বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং বাংলার সঙ্গীত ও সাহিত্য ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়— যার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায় বাংলা লোকসংস্কৃতির প্রতিটি সুরে।
সূত্রসমূহ:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা
সজনীকান্ত দাস, বাঙালির গান
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি (উপন্যাস)
হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বাংলার কবিগান ও কবিয়াল সংস্কৃতি
“Kavigan: The Folk Music Debate of Bengal”, Journal of South Asian Cultural Studies (1998)
