কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাস

কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাস একটি হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত, গভীর আধ্যাত্মিকতা, দার্শনিক চিন্তা এবং অপূর্ব শৈল্পিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে গঠিত এক অমূল্য ঐতিহ্য। এটি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের (বিশেষত অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু ও তেলঙ্গানা) সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কর্ণাটক সঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং ভক্তি, দর্শন এবং আত্মোন্নয়নের এক মহান সাধনা।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত করা হয়—উত্তর ভারতের হিন্দুস্তানি এবং দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক সঙ্গীত। কর্নাটকী সঙ্গীতের মূল বৈশিষ্ট্য হলো রাগের বিশুদ্ধতা ও শুদ্ধ প্রয়োগ, কঠোর তালব্যবস্থা, সুসংহত গঠনমূলক কাঠামো (বিশেষত কৃতি), গমক-সমৃদ্ধ আলাপনা-নিরাবল-স্বরকল্পনা এবং সর্বোপরি গভীর ভক্তিমূলক ভাবের প্রাধান্য।

. প্রাচীন উৎস: বৈদিক যুগ থেকে নাট্যশাস্ত্র

কর্নাটকী সঙ্গীতের শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় বৈদিক যুগে। সামবেদ-কে ভারতীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলিকে সুরারোপ করে গাওয়ার মাধ্যমে সঙ্গীতের প্রথম রূপ প্রকাশ পায়। যজুর্বেদে বীণার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা স্বর ও তালের সঙ্গে যুক্ত।

পরবর্তীকালে ভরত মুনিরনাট্যশাস্ত্র’ (খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের কাছাকাছি) স্বর, রাগ, তাল, রস ও ভাবতত্ত্বের বিস্তারিত আলোচনা করে। এই গ্রন্থ রসতত্ত্বের মাধ্যমে সঙ্গীতের সৌন্দর্যবোধের দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে। পরে শারঙ্গদেব-এর ‘সঙ্গীতরত্নাকর’ (১৩শ শতাব্দী) ভারতীয় সঙ্গীতের সামগ্রিক তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করে, যা কর্নাটকী ও হিন্দুস্তানি উভয় ধারার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

. ভক্তি আন্দোলন: সঙ্গীতের জনপ্রিয়করণ

খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ-৯ম শতাব্দী থেকে দক্ষিণ ভারতে আলভার (বৈষ্ণব) ও নায়নার (শৈব) সাধকদের ভক্তি আন্দোলন সঙ্গীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁরা তামিল ভাষায় অসংখ্য তেবারম ও দিব্য প্রবন্ধ রচনা করেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।

এই আন্দোলনের ফলে—

  • সঙ্গীত মন্দিরকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে,
  • দেবতাকে উদ্দেশ্য করে ভক্তিমূলক গীত রচনার ধারা প্রবল হয়,
  • সঙ্গীত জনসাধারণের ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার ভাষায় পরিণত হয়।

এই যুগে তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও সংস্কৃত ভাষায় ভক্তিমূলক কীর্তনের ভিত্তি স্থাপিত হয়, যা আজও কর্নাটকী সঙ্গীতের মূল সম্পদ।

. রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা মন্দির ঐতিহ্য

মধ্যযুগে চোল, পাণ্ড্য, বিজয়নগর সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে তাঞ্জাভুরের মারাঠা রাজারা কর্নাটকী সঙ্গীতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। রাজসভাগুলি সঙ্গীতচর্চা ও সৃষ্টির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

মন্দিরে সঙ্গীত কেবল উপাসনার অংশ নয়, বরং নিত্যকর্মের অপরিহার্য উপাদান হয়ে ওঠে। দেবদাসী প্রথার মাধ্যমে সঙ্গীত ও নৃত্যের ঐতিহ্য সংরক্ষিত ও সমৃদ্ধ হয়। রাজা, জমিদার ও ধনী ব্যক্তিদের অর্থানুকূল্যে সুরকার ও শিল্পীরা নির্বিঘ্নে সাধনা করার সুযোগ পান।

. পুরন্দর দাস: কর্নাটকী সঙ্গীতের পিতামহ

১৬শ শতাব্দীর মহান সাধক-সুরকার পুরন্দর দাস (১৪৮৪-১৫৬৪) কে কর্নাটকী সঙ্গীতের সঙ্গীত পিতামহ বলা হয়। তিনি সঙ্গীতশিক্ষাকে পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেন। তাঁর অবদান—

  • সরল থেকে জটিল স্তরে শিক্ষার ধারাবাহিক কাঠামো গড়ে তোলা,
  • মায়ামালবগৌলা রাগকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নির্ধারণ করা (যা আজও প্রচলিত),
  • স্বরাবলি, জন্তি স্বর, আলঙ্কার, গীত, বর্ণম প্রভৃতি গ্রেডেড অনুশীলন প্রবর্তন।

তাঁর হাজার হাজার কীর্তন (প্রধানত কন্নড় ভাষায়) ভক্তি ও সামাজিক সচেতনতার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটায়।

. ত্রয়ী যুগ: স্বর্ণযুগের ত্রিমূর্তি

১৮শ-১৯শ শতাব্দী কর্নাটকী সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ। এই যুগের তিন মহান সুরকার—ত্যাগরাজ, মুথুস্বামী দীক্ষিতরশ্যাম শাস্ত্রী—কে একত্রে কর্নাটকী সঙ্গীতের ত্রিমূর্তি বলা হয়।

  • ত্যাগরাজ (১৭৬৭-১৮৪৭): শত শত কৃতি রচনা করেন। তাঁর রচনায় সরল সুর, গভীর রামভক্তি ও তীব্র আবেগের অপূর্ব সমন্বয়।
  • মুথুস্বামী দীক্ষিতর (১৭৭৬-১৮৩৫): সংস্কৃত ভাষায় রচিত কৃতিগুলি রাগের শুদ্ধতম রূপ প্রকাশ করে। বহু বিরল রাগকে তিনি সঙ্গীতে চিরস্থায়ী রূপ দেন।
  • শ্যাম শাস্ত্রী (১৭৬২-১৮২৭): তালের বৈচিত্র্য, জটিল প্রয়োগ এবং শক্তিশালী দেবীভক্তির জন্য বিখ্যাত।

তাঁদের কৃতি আজও কর্নাটকী সঙ্গীতের প্রাণ।

. মেলকার্তা রাগ পদ্ধতি: তাত্ত্বিক বিপ্লব

১৭শ শতাব্দীতে ভেঙ্কটমাখিন তাঁর ‘চতুর্দণ্ডী প্রকাশিকা’ গ্রন্থে ৭২ মেলকার্তা রাগ-এর পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে—

  • সম্পূর্ণ (সম্পূর্ণ সপ্তক) রাগগুলির শাস্ত্রীয় শ্রেণিবিন্যাস সম্ভব হয়,
  • জন্য রাগ ও মেল রাগের পার্থক্য স্পষ্ট হয়,
  • কাতাপয়াদি সংখ্যা পদ্ধতির মাধ্যমে রাগের নামকরণ সুবিন্যস্ত হয়।

পরবর্তীকালে গোবিন্দাচার্য এই পদ্ধতিকে আরও সমৃদ্ধ করেন। সুব্বারাম দীক্ষিত-এর ‘সঙ্গীত সংপ্রদায় প্রদর্শিনী’ এই পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ সংকলন।

. ঔপনিবেশিক যুগ থেকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

ব্রিটিশ যুগে মুদ্রণযন্ত্রের প্রসারে সঙ্গীতগ্রন্থ প্রকাশ সহজ হয়। পাশ্চাত্য প্রভাব সত্ত্বেও কর্নাটকী সঙ্গীত তার মূল স্বরূপ অক্ষুণ্ণ রাখে। ২০শ শতাব্দীতে সঙ্গীত বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও সভা (যেমন মাদ্রাজ মিউজিক সিজন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

. বিশ্বায়ন সমকালীন যুগ

আজকের যুগে ইন্টারনেট, ডিজিটাল রেকর্ডিং, ইউটিউব ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর্নাটকী সঙ্গীত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়, বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় এর চর্চা অব্যাহত। সমকালীন শিল্পীরা যেমন এম. এল. বালমুরলিকৃষ্ণ, আরুণা সাইরাম, টি. এম. কৃষ্ণ, সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম প্রমুখ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, এমনকি ফিউশন ও জ্যাজের সঙ্গে মিলিয়েও।

কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কেবল একটি সঙ্গীতধারা নয়—এটি হাজার বছরের অবিরাম সাধনা, ভক্তি, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার জীবন্ত প্রমাণ। এর ইতিহাস দক্ষিণ ভারতের আত্মার ইতিহাস। যুগে যুগে এই ধারা মানুষকে আলোকিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও তার ঐতিহ্য অম্লান থাকবে, নতুন প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়ে চলবে।