কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী রুনা লায়লার জন্মদিনের সঙ্গীত গুরুকুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ শুধু জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায় না, তারা একসময় নিজেই ইতিহাস হয়ে ওঠে। রুনা লায়লা সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁর কণ্ঠ উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি এবং কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ২০১৮ সালের এই জন্মদিনে মিউজিক গুরুকুলের পক্ষ থেকে এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া রুনা লায়লার শৈশব কেটেছে সংগীতময় এক পরিবেশে। তাঁর বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ ইমদাদ আলী ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা আমিনা লায়লা ছিলেন সংগীতপ্রেমী। ছোটবেলা থেকেই ঘরে সংগীতচর্চার আবহ ছিল প্রবল। তাঁর বড় বোন দিনা লায়লার সঙ্গে বসে বসেই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্ম নেয়। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতে শুরু করেন। করাচিতে স্কুলজীবনে আন্তঃস্কুল সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে তিনি নিজের প্রতিভার প্রথম বড় স্বীকৃতি পান।

শৈশবে তিনি শুধু গান নয়, নৃত্যেও আগ্রহী ছিলেন। কথক ও ভরতনাট্যমের প্রাথমিক শিক্ষা তাঁর মঞ্চ উপস্থাপনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। পরবর্তীতে ওস্তাদ আবদুল কাদের পেয়ারাং ও ওস্তাদ হাবিবউদ্দিন আহমেদের কাছে তাঁর শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত মজবুত হয়। এই দৃঢ় শিক্ষাই পরবর্তী সময়ে তাঁর কণ্ঠকে বহুমাত্রিক করে তোলে। গজল, আধুনিক, চলচ্চিত্র সংগীত, লোকগান, সুফি—সব ধারাতেই তিনি স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠেন।

রুনা লায়লার পেশাদার সংগীতজীবনের শুরু খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি উর্দু চলচ্চিত্র Jugnu-তে প্রথম প্লেব্যাক করেন। এরপর পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের শেষভাগ ও সত্তরের দশকে তিনি উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পীতে পরিণত হন। বিশেষ করে আহমেদ রুশদির সঙ্গে তাঁর দ্বৈত গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরে বাংলাদেশে ফিরে তিনি বাংলা আধুনিক গান ও চলচ্চিত্র সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেন।

বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে তাঁর কণ্ঠ মানেই আবেগ, মাধুর্য এবং অনন্য সুরসুষমা। “গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা”, “সুজন মাঝি রে”, “দমাদম মাস্ত কালান্দার”—এমন অসংখ্য গান তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিল্পী করে তুলেছে। বাংলা, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, এমনকি ইংরেজিসহ বহু ভাষায় গান গেয়ে তিনি নিজেকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক শিল্পীর মর্যাদায় নিয়ে গেছেন।

তাঁর অবদান শুধু সংগীতে সীমাবদ্ধ নয়; মানবিক কাজেও তিনি সমানভাবে স্মরণীয়। তাঁর বোনের মৃত্যু ক্যান্সারে হওয়ার পর তিনি ঢাকায় ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে সহায়তার জন্য চ্যারিটি কনসার্ট আয়োজন করেন। পরবর্তীতে তিনি SAARC Goodwill Ambassador for HIV/AIDS হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৮ সালও রুনা লায়লার জন্য ছিল সম্মান ও স্বীকৃতিতে ভরা একটি বছর। এই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “ফিরোজা বেগম মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল ২০১৮” লাভ করেন, যা তাঁর দীর্ঘ সংগীতসাধনার প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। একই বছরে তাঁর শিল্পীজীবনের ৫৪ বছরেরও বেশি পথচলার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেছিলেন—“আমি এখনও শিখছি।” এই বিনয়ই তাঁকে আরও বড় করে তোলে।

মিউজিক গুরুকুলের দৃষ্টিতে রুনা লায়লা শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি যুগ এবং সংগীতের এক জীবন্ত বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে সুরের শুদ্ধতা, উপস্থাপনার সৌন্দর্য এবং শিল্পীসত্তার দায়বদ্ধতা।

জন্মদিনে মিউজিক গুরুকুলের পক্ষ থেকে কিংবদন্তি রুনা লায়লার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা এবং দীর্ঘ সুস্থ জীবনের শুভকামনা। তাঁর সুরের আলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংগীতযাত্রাকে চিরকাল আলোকিত করুক।

 

ফটো গ্যালারী