১৯৮০–এর দশক ছিল সাহস, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রবল সৃষ্টিশক্তির এক যুগ—যখন পশ্চিমা সংগীত নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলে বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর শোনার, দেখার ও বাঁচার ধরণ। এ ছিল সিনথেসাইজার আর সিকোয়েন্সারের যুগ, আইলাইনার আর ইলেকট্রিক গিটারের যুগ, প্রতিবাদের গান আর নিয়ন–আলোয় রাঙা পপ সঙ্গীতের যুগ। আশির দশক শুধু একটি প্রজন্মের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকই ছিল না, এটি সেই প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
নিউ ওয়েভের তীব্র তাল থেকে শুরু করে অ্যারেনা রকের বিস্ফোরণধর্মী কোরাস, সিনথপপের যান্ত্রিক নিখুঁততা থেকে হেভি মেটালের কাঁচা শক্তি—১৯৮০–এর পশ্চিমা ব্যান্ডগুলো এক এমন সঙ্গীত–সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল যার প্রতিধ্বনি আজও আধুনিক চার্টে অনুরণিত।
Table of Contents
নতুন সাউন্ড যুগের সূচনা
১৯৭০–এর পরীক্ষাধর্মী ও বিদ্রোহী সংগীতের পর ১৯৮০–এর দশক নিয়ে এল ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন ও নতুন সৃষ্টিশীল আশাবাদের যুগ। সাশ্রয়ী সিনথেসাইজার, ড্রাম মেশিন এবং MIDI প্রযুক্তির আবির্ভাব বদলে দিল সংগীত সৃষ্টির ও পরিবেশনের ধারা।
হঠাৎ করেই শিল্পীরা কীবোর্ড থেকে পুরো অর্কেস্ট্রার সুর গঠন করতে পারলেন, কম্পিউটারে বিট তৈরি করতে পারলেন, এমন সব শব্দ তৈরি করতে পারলেন যা আগে কখনও ছিল না। এই পরিবর্তন শুধু সংগীত তৈরির পদ্ধতিই বদলায়নি—বদলে দিয়েছিল সংগীতের সংজ্ঞাই।
এটি ছিল এমন এক দশক যা জন্ম দিয়েছিল নতুন ধরনের তারকা—যিনি বুঝতেন, সংগীত শুধু সুরের নয়, রূপেরও শিল্প।
পপ সংগীতের শক্তিশালী উত্থান
যদি ১৯৮০–এর সংগীতের একটিমাত্র হৃদস্পন্দন থাকত, তা হতো পপ—রঙিন, সুরেলা, নাচের উপযোগী। সবার আগে ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন, “কিং অফ পপ”, যার ১৯৮২ সালের অ্যালবাম Thriller সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত রেকর্ড। ফাঙ্ক, আরঅ্যান্ডবি, রক ও ইলেকট্রনিক সংগীতের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ—এবং তার অসাধারণ ভিডিও ও নৃত্যনৈপুণ্যের সাথে—সঙ্গীতজগতে স্থাপন করেছিল এক নতুন বৈশ্বিক মানদণ্ড।
অন্যদিকে, ম্যাডোনা নারীত্বের শক্তিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সাহসী, বিতর্কিত এবং সদা–নবীকৃত, তিনি পপ সংগীতকে পরিণত করেন আত্মপ্রকাশ ও ক্ষমতায়নের মাধ্যম হিসেবে। Like a Virgin থেকে Vogue—ম্যাডোনা শুধু চার্ট দখলই করেননি, বরং পুনর্লিখন করেছিলেন ফ্যাশন, নারীবাদ ও আইডেন্টিটির ধারণা।
ব্রিটেনে জর্জ মাইকেল ও Wham! এনেছিলেন পপ–সংগীতে আত্মার গভীরতা, আর প্রিন্স মুছে দিয়েছিলেন ফাঙ্ক, রক ও যৌনতার সীমানা। তার ঝলমলে ব্যক্তিত্ব ও রীতিবহির্ভূত সুর তাঁকে শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত করেছিল।
আশির দশকের পপ শুধু গান ছিল না—এ ছিল এক আন্দোলন। উজ্জ্বল, বর্ণময়, আন্তর্জাতিক ও নিঃসংকোচে গ্ল্যামারাস।
রক ও মেটালের সোনালি যুগ
আশির দশক ছিল রক সংগীতের বিস্ফোরণকাল—বড় থেকে আরও বড়। অ্যারেনা রক ও হেভি মেটাল দাপিয়ে বেড়িয়েছে রেডিও ও স্টেডিয়াম, আগুন ও আলোয় ভরা চমৎকার সব পরিবেশনা দিয়ে।
বন জোভি, ডেফ লেপার্ড, গানস এন’ রোজেস, এরোস্মিথ—তাঁরা লাখো মানুষের জন্য গিটার–নির্ভর সংগীত রচনা করেছিলেন, যা মঞ্চে ও স্টেডিয়ামে একসাথে গাওয়ার মতো করে তৈরি।
অন্যদিকে, আয়ারল্যান্ডের U2 তাদের The Joshua Tree (১৯৮৭) অ্যালবামের মাধ্যমে আত্মার গভীরতা ও রাজনৈতিক চেতনা একত্রিত করে বৈশ্বিক তারকায় পরিণত হয়।
আরও ভারী ধারায়, মেটালিকা, আয়রন মেইডেন ও মোটরহেড হেভি মেটালকে পৌঁছে দিয়েছিল চরমে—সঙ্গীতগত ও প্রযুক্তিগত দুই ক্ষেত্রেই।
যুক্তরাজ্যে নিউ ওয়েভ অফ ব্রিটিশ হেভি মেটাল (NWOBHM) আন্দোলনে জুডাস প্রিস্ট ও স্যাকসন–এর মতো ব্যান্ড আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসে মূলধারায়। তাদের গতি, নিখুঁততা ও শো–ম্যানশিপ অনুপ্রাণিত করেছে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পীকে।
সিনথপপ ও নিউ ওয়েভ বিপ্লব
যেখানে একদিকে গিটার রাজত্ব করছিল, অন্যদিকে সিনথেসাইজার জয় করছিল শ্রোতাদের মন। সিনথপপ ও নিউ ওয়েভ পশ্চিমা সংগীতকে দিয়েছিল নতুন এক ভাষা—চকচকে, আধুনিক, আবার আবেগপূর্ণ।
ব্রিটিশ ব্যান্ড যেমন Depeche Mode, Duran Duran, The Human League, Ultravox, OMD, এবং Tears for Fears এই ধারা নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাদের সুর ছিল সংক্রামক, প্রযোজনা ছিল বিপ্লবাত্মক। Enjoy the Silence, Don’t You Want Me, Everybody Wants to Rule the World আজও ইলেকট্রনিক পপের ক্লাসিক উদাহরণ।
জার্মানিতে Kraftwerk ও Alphaville ইলেকট্রনিক সংগীতকে মিনিমালিস্ট ধারায় পরিণত করেন, যা পরবর্তীতে টেকনো ও ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিকের ভিত্তি গড়ে তোলে।
সিনথপপের সিনেমাটিক সাউন্ড ও মেলানকলিক কথা সেই সময়ের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রতিফলন—যেখানে প্রযুক্তি ও অনুভূতি এক অপূর্ব ভারসাম্যে মিলিত হয়েছিল।
এমটিভি প্রজন্ম: যখন সংগীত পেল চিত্র
১৯৮১ সালে MTV (মিউজিক টেলিভিশন) শুরু হয়—এবং সংগীত আর কখনো আগের মতো থাকেনি। প্রথমবারের মতো দর্শকরা শুধু গান শুনতেন না, তাঁরা গায়কদের দেখতেও পারতেন।
ডুরান ডুরান–এর Rio ভিডিও, A-ha–এর অ্যানিমেটেড Take On Me, এবং মাইকেল জ্যাকসনের Thriller–এর মতো সৃষ্টি শিল্প ও বিনোদনের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল। সঙ্গীত, সিনেমা ও ফ্যাশনের সীমারেখা মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছিল বৈশ্বিক ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা।
এমটিভি–এর কারণে শিল্পীরা তাঁদের সঙ্গীতের মতোই চেহারা ও পোশাককেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেন—The Police–এর মিনিমালিজম, Culture Club–এর বর্ণচ্ছটা, The Cure–এর গথিক স্টাইল—সবই এই সময়ের সৃষ্টি।
এই শ্রুত ও দৃষ্টিশিল্পের যুগে ১৯৮০–এর দশক হয়ে উঠেছিল সংগীত ও পপ সংস্কৃতির এক স্বর্ণযুগ।
সংগীত, রাজনীতি ও ব্যান্ডের শক্তি
আশির দশক ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার যুগ। ১৯৮৪ সালে Band Aid–এর Do They Know It’s Christmas? এবং ১৯৮৫–এর Live Aid কনসার্ট মানবতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখে। U2–এর Sunday Bloody Sunday শান্তির বার্তা ছড়ায়, আর Sting, Peter Gabriel, Bruce Springsteen–এর মতো শিল্পীরা মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে আওয়াজ তোলেন। এই ব্যান্ডগুলো দেখিয়েছিল, সংগীত কেবল বিনোদন নয়—এটি সচেতনতা, সহানুভূতি ও বিশ্বসংহতির শক্তি।
আন্ডারগ্রাউন্ড ও বিকল্প সংগীত
মূলধারার বাইরে, আশির দশকে বিকশিত হয় পোস্ট–পাঙ্ক ও অল্টারনেটিভ রক। The Smiths, Joy Division, The Cure, Echo & the Bunnymen–এর মতো ব্যান্ড আবেগ, প্রেম ও বিষণ্ণতার গান গেয়েছিল—যা মূলধারার গ্ল্যামারাস পপের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমেরিকায় R.E.M., Sonic Youth, Pixies–এর মতো ব্যান্ড তৈরি করে দিয়েছিল ৯০–এর দশকের গ্রাঞ্জ ও অল্টারনেটিভ রকের ভিত। তাদের স্বাধীন সৃষ্টিশীলতা বাণিজ্যিকতার ওপরে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছিল।
প্রযোজনা, উদ্ভাবন ও স্টুডিওর বিপ্লব
প্রত্যেক মহান আশির দশকের ব্যান্ডের পেছনে ছিলেন একজন দূরদর্শী প্রযোজক। Trevor Horn, Brian Eno, Quincy Jones, Mutt Lange, Nile Rodgers–এর মতো নামগুলো বদলে দিয়েছিল সংগীত রেকর্ডিংয়ের ধারণা।
মাল্টি–ট্র্যাক রেকর্ডিং, ডিজিটাল রিভার্ব ও সিনথ লেয়ারিং–এর মাধ্যমে স্টুডিওই হয়ে উঠেছিল একটি যন্ত্র। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব ছোট ব্যান্ডগুলোকেও বিশ্বমানের প্রযোজনার সুযোগ দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে আধুনিক হোম–স্টুডিও যুগের ভিত্তি গড়ে দেয়।
উত্তরাধিকার: আশির প্রতিধ্বনি
চার দশক পরও আশির দশকের চেতনা সর্বত্র বিরাজমান। The Weeknd, Dua Lipa, Harry Styles, Lorde, Daft Punk, The 1975, Arctic Monkeys–এর মতো শিল্পীরা আজও আশির সাউন্ড ও নান্দনিকতা থেকে অনুপ্রাণিত। Stranger Things থেকে Drive পর্যন্ত চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে আশির প্রভাব আজও স্পষ্ট—কারণ এই দশক ছিল সম্ভাবনার প্রতীক। এটি ছিল পরীক্ষার, আবেগের, শক্তির যুগ—যেখানে বিশ্বাস করা হতো, সংগীত হতে পারে যেকোনো কিছু।
এক দশক যা কখনো ম্লান হয় না
শেষ বিচারে ১৯৮০–এর সংগীত শুধু সাউন্ড নয়—এটি ছিল এক বিবৃতি। এটি উদ্যাপন করেছিল স্বকীয়তা, উদ্ভাবন ও শিল্পের মাধ্যমে পরিচয় গড়ে তোলার সাহস।
Depeche Mode–এর ঝলমলে সিনথ থেকে U2–এর উড্ডীয়মান গিটার, Queen–এর মহাকাব্যিক সুর থেকে Bon Jovi–এর পাওয়ার ব্যালাড—এই দশক দিয়েছিল এমন বৈচিত্র্যময় সংগীত যা মহাদেশ ও সংস্কৃতি পেরিয়ে একসূত্রে বাঁধে বিশ্বকে।
এটি ছিল এমন এক যুগ, যা মানুষকে শিখিয়েছিল নাচতে, স্বপ্ন দেখতে, আর সাহসী হতে। আর আজও আধুনিক সংগীতের তালে সেই বৈদ্যুতিক দশকের প্রতিধ্বনি শোনা যায়—মনে করিয়ে দেয়, একসময় পৃথিবী সত্যিই “স্টেরিওতে বেঁচে ছিল”।
