খাদ্য-ঔষধের সংকটে কষ্টে কাঙালিনী সুফিয়া

লোকগানের সুপরিচিত শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া বর্তমানে শারীরিক ও আর্থিক সংকটে বিপন্ন। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ ও অন্যান্য জটিল সমস্যায় ভুগছেন তিনি। গত এক সপ্তাহ ধরে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা, মুখের ফোলাভাব ও কথা বলার অসুবিধা দেখা দিয়েছে। তবে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই, আর ঈদের আগমনের সঙ্গে ঘরে বাজারের অভাব কষ্টকে আরও তীব্র করছে।

কথাগুলো বলছিলেন কাঙালিনী সুফিয়া নিজেই:

“চার মাসের ভাড়া বাকি, খাওনের টাকা নেই, ওষুধ কিনব কই থাইকা।”

শিল্পীর সংসার কয়েক বছর ধরে ধার-দেনার উপর চলছে। ২০১৯ সালে দেনা মেটাতে তিনি সাভারের পূর্ব জামসিং এলাকার নিজস্ব বাড়ি বিক্রি করেন। বর্তমানে উত্তর জামসিংয়ের একটি ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

ভাতা ও অনুদান কমেছে

শিল্পীর আর্থিক সহায়তা মূলত সরকারি ভাতা ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অনুদানের উপর নির্ভর করত।

আর্থিক সহায়তার ধরণপূর্বের পরিমাণবর্তমান পরিমাণমন্তব্য
সাংস্কৃতিক ভাতা42,000 টাকা/বছর12,000 টাকা/বছর২০২২ সাল থেকে কমানো হয়েছে
প্রধানমন্ত্রীর মাসিক অনুদান10,000 টাকা/মাস0 টাকা/মাসঅন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বন্ধ

কাঙালিনী সুফিয়ার একমাত্র কন্যা পুষ্প বেগম বলেন, “বছরের শুরুতে ভাতা পেলে কিছুটা কাজ চলত। কিন্তু গত বছর মাত্র ১২ হাজার টাকা পেয়েছি। আর প্রধানমন্ত্রীর অনুদানও বন্ধ হয়ে গেছে, তাই সংসার আরও সংকটে।”

আয় ও অনুষ্ঠানের অভাব

প্রতিটি মাসে অনুষ্ঠান ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের আয়ও ছিল তাঁর জীবিকার অংশ। তবে করোনাকাল ও অন্যান্য কারণে অনুষ্ঠান প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। বিটিভি এবং বেসরকারি চ্যানেল থেকে ডাক এসেছে, কিন্তু গত পাঁচ মাসে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি। পুষ্প বেগম বলেন, “কিছুদিন আগেও প্রতি মাসে অনুষ্ঠান থাকত, এখন শূন্য। আয় নেই, তাই চারদিক থেকে বিপদে রয়েছি।”

চিকিৎসা ও পুষ্টির সংকট

শিল্পীর চিকিৎসা ব্যয় প্রতি মাসে ৮–১০ হাজার টাকা। এছাড়া পুষ্টিকর খাবার, দুধ ও ডিমের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে ঘরে এমন অর্থ নেই। পুষ্প বেগম বলেন, “ভিক্ষুকের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি আমরা। একবেলা খাই, আরেকবেলা খেতে পারি না। ধারের টাকায় বাজার করি, তবুও খাবারের জন্য চাপ।”

সম্বল ও ভবিষ্যৎ

২০২০ সালের পর ধার করা ১৫ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য সাভারের জমিসহ বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। নতুন জায়গা কিনলেও সেখানে বাড়ি নির্মাণের সামর্থ্য নেই, তাই ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। পরিবার আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে এই জমিও বিক্রি করতে হবে।

শিল্পী এ সংকটের মাঝেও সাহায্য চাইতে চান না। কষ্টের মধ্যেও তিনি গান গাইতে চান।

পরিচয় ও অবদান

কাঙালিনী সুফিয়ার জন্ম রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে। প্রকৃত নাম টুনি হালদার। ১৪ বছর বয়সে গ্রাম্য অনুষ্ঠানে গান করে নজর কাড়েন। তাঁর গুরুদের মধ্যে ছিলেন গৌর মহন্ত, দেবেন খ্যাপা ও হালিম বয়াতি। ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই’

  • ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’

  • ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’

  • ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’

শিল্পীর অবস্থা দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সহায়তার কাঠামোর অগ্রগতি ও অভাবের একটি তীব্র চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।