গয়া ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা

উনিশ শতকের মধ্যভাগে খেয়াল গান ও এস্রাজ বাদনের ক্ষেত্রে যে অনন্য ও স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠে, তা-ই পরে ‘গয়া ঘরানা’ নামে পরিচিতি পায়। এই ধারা সৃষ্টির প্রধান দুজন শিল্পী ছিলেন হরি সিং এবং তাঁর পুত্র হনুমান দাস সিং। খেয়ালের রাগবিন্যাস, স্বরপ্রয়োগ, তানের কারুকার্য এবং এস্রাজে খেয়ালের অঙ্গ অনুকরণের অভিনব কৌশল গয়া ঘরানাকে অন্যান্য ঘরানা থেকে বিশেষভাবে পৃথক করে তোলে।

Music Gurukul Logo 512x512

এ ঘরানার বিস্তার শুধু উত্তর ভারতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উনিশ শতকের শেষভাগে হরি সিং–হনুমান দাস সিং-এর একনিষ্ঠ ভক্ত ও শিষ্য কানাইলাল ঢেঁড়ি বাংলায় এই ধারা প্রচারে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর কঠোর সাধনা, রাগসিদ্ধি এবং এস্রাজে পারদর্শী ভঙ্গিমা গয়া ঘরানাকে এক নতুন পরিচিতি দেয়। বঙ্গদেশের বহু বিশিষ্ট শিল্পী যেমন—অমৃতলাল দত্ত, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর—কানাইলাল ঢেঁড়ির কাছে তালিম গ্রহণ করে গয়া ঘরানার রীতিনীতি আরও বিস্তার ও প্রতিষ্ঠা ঘটান।

পরবর্তীকালে হনুমান দাস সিং-এর পুত্র মোহন দাস সিং এই ঘরানাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। তাঁর উদ্যোগে ঠুংরি গায়নের ধাঁচ এবং হারমোনিয়াম বাদনের নতুন কিছু কৌশল গয়া ঘরানার পরিবেশনায় যুক্ত হয়। ফলে গয়া ঘরানা হয়ে ওঠে বহু-ধারাকে ধারণকারী এক স্বতন্ত্র সঙ্গীতরূপ।

YaifwwriN4BzRFCyqbslL4 গয়া ঘরানা | গীত ঘরানা, কণ্ঠশিল্পী বা গানের ঘরানা | সঙ্গীতের ঘরানা
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

গয়া ঘরানার বৈশিষ্ট্য:

গয়া ঘরানার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ—

১. খেয়াল গানের চমৎকার বন্দিশ

এই ঘরানার খেয়াল বন্দিশে স্বরবিন্যাস অত্যন্ত মার্জিত ও নির্মিত। রাগের ভাস্কর্যকে তুলে ধরতে স্বরের মাঝারি গতি ও সূক্ষ্ম অলঙ্করণ ব্যবহৃত হয়।

২. সুরের মাধুর্যপূর্ণ, সুস্পষ্ট বাণীপ্রকাশ

গান শুধু সুরময়ই নয়; বাণীর স্বচ্ছ উচ্চারণ গয়া ঘরানার একটি মূল বৈশিষ্ট্য। গায়ক শ্রোতাকে অর্থবোধ ও আবেগ—উভয়ই পৌঁছে দিতে বিশেষ যত্নশীল থাকেন।

৩. এস্রাজে খেয়াল অঙ্গের নিখুঁত অনুকরণ

গয়া ঘরানা এস্রাজ বাদনে আলাদা করে পরিচিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • জোড়–এ স্বরবিন্যাসের ধীর ও গম্ভীর বিস্তার
  • তান–এ কণ্ঠস্বরের গতি ও কারুকার্য অনুকরণ
  • ঝালা–এ দ্রুত ও জটিল মীড়, গমক ও প্রয়োগ

এসবই মিলিয়ে এস্রাজে এমন এক কণ্ঠস্বরসদৃশ গায়কি সৃষ্টি হয়, যা অন্য ঘরানায় তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

Leave a Comment