গাজন বা গাজন গান ভারতের পূর্বাঞ্চল, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, ও উত্তর প্রদেশের কিছু অঞ্চলের এক প্রাচীন ধর্মীয় ও লোকসঙ্গীতধারা।
এটি মূলত শিব, ধর্মঠাকুর, নিসান দেবতা বা গ্রামদেবতার উপাসনা ও পূজা উপলক্ষে গাওয়া হয়।
গাজন শব্দটি এসেছে “গজ” (আনন্দ বা উল্লাস) ও “জন” (জনসমাগম) শব্দের সংমিশ্রণ থেকে, অর্থাৎ “জনসমাগমে আনন্দ প্রকাশ”—এই অর্থে গাজন।
এটি কেবল একটি গান নয়; বরং এটি একটি পূজা, একধরনের লোকনাট্য, ধর্মীয় উৎসব ও সংগীতধারা—সব মিলিয়ে একটি সামগ্রিক লোকজ ঐতিহ্য।
Table of Contents
গাজনের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
গাজনের উৎপত্তি বহু প্রাচীন। ধারণা করা হয়, পৌরাণিক যুগে শিবপূজার সঙ্গে সম্পর্কিত লোকাচার থেকেই গাজনের সূচনা।
বৈদিক যুগে “রুদ্র” দেবতার আরাধনা, পরে “শিব” রূপে পরিণত হয়ে এই গাজন উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পায়।
কৃষিনির্ভর সমাজে শস্যের ভালো ফলনের আশায় মানুষ দেবতাকে তুষ্ট করতে নানা রীতি পালন করত—গাজন সেই বিশ্বাস থেকেই গড়ে উঠেছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, গাজনের সংগীতধারা পাল ও সেন যুগে (৮ম–১৩শ শতাব্দী) গ্রামীণ বাংলায় সুসংহত আকার ধারণ করে।
তৎকালীন সমাজে গাজন ছিল একধরনের “সামাজিক উৎসব”, যেখানে ধর্ম, সঙ্গীত, নাট্য ও গ্রামীণ ঐক্যের প্রকাশ ঘটত।
গাজন গান ও এর প্রকৃতি
গাজন গান মূলত শিবগাজন, ধর্মগাজন, নীলগাজন, বা নরসিংহগাজন—এই চার প্রকারে বিভক্ত।
প্রত্যেকটির কেন্দ্রে থাকে নির্দিষ্ট দেবতার আরাধনা।
এর মধ্যে শিবগাজন সবচেয়ে জনপ্রিয়, যেখানে ভক্তরা “বোলবম” উচ্চারণে শিবের স্তবগান করে ও গানে গানে তাঁর মহিমা বর্ণনা করে।
গাজনের গান সাধারণত বাংলা, আঞ্চলিক উপভাষা বা ব্রজবুলি ভাষায় রচিত হয়।
এর সুর ও তাল সহজ, আবেগপূর্ণ এবং সাধারণ মানুষের অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে থাকে।
গাজন উৎসব ও সামাজিক তাৎপর্য
গাজন উৎসব সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে (মধ্য এপ্রিলের দিকে) পালিত হয়, অর্থাৎ বছরের শেষ দিনে—যা “চৈত্রসংক্রান্তি” নামে পরিচিত।
এই সময় মানুষ নতুন বছরের আগমনের পূর্বে পাপমোচন, শুদ্ধি ও পরিশুদ্ধ আত্মার প্রত্যাশায় বিভিন্ন উপাসনা ও ব্রত পালন করে।
গাজনের অন্যতম আকর্ষণ হলো “শিবসেবক” বা “সন্ন্যাসীরা”, যাঁরা উপবাস, কঠোর তপস্যা ও নানা কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে শিবের সন্তুষ্টি কামনা করেন।
তাঁরা গাজন গানের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক কষ্টসাধনের নানা প্রদর্শনী করেন—যেমন আগুনে হেঁটে চলা, কাঁটায় ঝাঁপ দেওয়া, হুক দোলনা (চড়ক) চড়া, গায়ে কাঁটা ফোঁড়ানো ইত্যাদি।
এগুলো শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহিষ্ণুতা ও ভক্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
গাজন গানের রূপ ও সুরধারা
গাজন গান সাধারণত ধর্মীয় স্তবগান ও আখ্যানমূলক গীতিকবিতা আকারে পরিবেশিত হয়।
এতে দেবতার জন্ম, কর্ম, ক্রোধ, দয়া, প্রেম, কিংবা ভক্তের কাহিনি ছন্দ ও সুরে গাঁথা থাকে।
এর সুরে শোনা যায় ধ্রুপদ, কীর্তন, বাউল, ও ভাটিয়ালি সঙ্গীতের ছোঁয়া।
গাজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমষ্টিগত গায়ন—যেখানে গ্রামীণ পুরুষ ও নারী মিলিতভাবে একসাথে গায়।
গানের সঙ্গে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রসমূহের মধ্যে আছে—
ঢোল, কাঁসা, ঝাঁঝরি, মন্দিরা, করতাল, ও শঙ্খ।
সুর ও ছন্দের তীব্রতা ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান, যা শ্রোতাকে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক উন্মাদনায় পৌঁছে দেয়।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ভাবার্থ
গাজন গান শুধুমাত্র শিব বা ধর্মঠাকুরের আরাধনা নয়, এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি ও প্রকৃতির সঙ্গে ঐক্যের প্রতীক।
এ গানে মানুষ প্রার্থনা করে—
“হে মহাদেব, আমাদের পাপ ধুয়ে দাও, আমাদের জীবনে শান্তি আনো।”
এই গানে ভক্তি, ভয়, করুণা, অনুতাপ ও আনন্দ—সব অনুভূতির এক সংমিশ্রণ দেখা যায়।
এটি মূলত “ভক্তি আন্দোলন”-এর ধারাবাহিকতায় বিকশিত, যেখানে সাধারণ মানুষ দেবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে গানের মাধ্যমে।
গাজন ও লোকনাট্য
গাজনের গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গাজন নাটক বা ধর্মনাট্য—যা মূলত মঞ্চনির্ভর লোকনাট্য।
এতে দেবতার কাহিনি অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় এবং গানের সঙ্গে নাটকীয় সংলাপ ও নৃত্য জুড়ে থাকে।
এই নাট্যরূপ গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় প্রচার, নৈতিক শিক্ষা এবং বিনোদনের সমন্বয় ঘটায়।
সাহিত্যিক প্রভাব
গাজন গানের প্রভাব বাংলা কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, চণ্ডীগান, পালাগান, বাউলগান—এমনকি বঙ্গীয় নাট্যধারার প্রাথমিক বিকাশেও লক্ষ্য করা যায়।
অনেক প্রাচীন কবি যেমন ভারতচন্দ্র রায়, দ্বিজ মাধব, রামপ্রসাদ সেন প্রমুখের রচনায় গাজনের ভাবধারা প্রতিফলিত হয়েছে।
আধুনিক কালে গাজন
বর্তমানে গাজন গান শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার লোকসংস্কৃতি, লোকনাট্য ও সংগীত ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, আসাম, এমনকি বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলেও (যেমন যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী) আজও গাজন পালিত হয়।
রেডিও, টেলিভিশন এবং লোকসংগীত উৎসবে এখন গাজন গান নিয়মিতভাবে পরিবেশিত হয়।
অনেক শিল্পী একে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন, তবে মূল ধারা এখনও আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তির ভিত্তিতেই টিকে আছে।
গাজন গান বাংলার লোকসংস্কৃতির এক প্রাচীন ও অনন্য উত্তরাধিকার। এটি শুধু ধর্মীয় সঙ্গীত নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, ঐক্য, ত্যাগ ও ভক্তির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বর্ষার মতোই এর সুরে আছে উন্মাদনা, কষ্ট, আনন্দ ও আত্মসমর্পণের ছোঁয়া। যেমন শিব “সংহারক” হয়েও জীবনের পুনর্জন্মের প্রতীক, তেমনি গাজন গানও আমাদের মনে পুনর্জাগরণের সুর তোলে—
“ভক্তি হোক প্রেরণা, সঙ্গীত হোক মুক্তির পথ।”