‘ঘুড়ি’ থেকে ‘ঈশ্বর’—সোমেশ্বরী নদী থেকে গানের অলিতে যাত্রা

সকালের ব্যস্ত মেট্রোরেল, অফিসফেরত বাসের ক্লান্ত যাত্রা কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধতায়—হেডফোনে ভেসে আসে কিছু গান, যেগুলো না চাইলেও হৃদয়ে দাগ কাটে।
“ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো…” কিংবা “ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারত না…”—এই লাইনগুলো বহু মানুষের ভালোবাসা, বিচ্ছেদ আর দীর্ঘশ্বাসের ভাষা হয়ে উঠেছে। অথচ এসব গানের নেপথ্যের মানুষটি থাকেন প্রচারের আলো থেকে খানিকটা দূরে। তিনি গীতিকার সোমেশ্বর অলি—নীরব, সংযত, কিন্তু শব্দে অসম্ভব শক্তিশালী এক শিল্পী।

আজ তাঁর জন্মদিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে উঠছে শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণা, গানের লাইন। কিন্তু দিনটি তিনি কাটাচ্ছেন খুব সাধারণভাবে—বাসা বদলের কাজে ব্যস্ত। এই সাধারণতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাঁর পুরো জীবনদর্শন।

সোমেশ্বরী নদীর পাড় থেকে শব্দের জগৎ

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সোমেশ্বরী নদীর তীরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সোমেশ্বর অলির। কৃষিভিত্তিক এক সচ্ছল পরিবারে বড় হওয়া এই মানুষটির শৈশব কেটেছে ধর্মীয় সুর, প্রকৃতি আর লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে। ভোরে বাবার কোরআন তিলাওয়াত, পাশের হিন্দু বাড়ির উলুধ্বনি, ঢাক–ঢোলের আওয়াজ—এই বহুধ্বনিই গড়ে দিয়েছে তাঁর সংবেদনশীল শ্রোতা সত্তা।

ঘরে টেলিভিশন ছিল না। রেডিওই ছিল তাঁর জানালা। স্কুলজীবন থেকেই গান ও কবিতার প্রতি এক ধরনের একাগ্র টান তৈরি হয়। কলেজে উঠে নেত্রকোনা শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়মিত বই পড়া, কবি–লেখকদের আড্ডা—সব মিলিয়ে তাঁর চিন্তাজগতে আসে বড় পরিবর্তন। কবিতাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিবাদ, স্বপ্ন আর আত্মপরিচয়ের ভাষা।

ঢাকা, সাংবাদিকতা এবং গানের পথে যাত্রা

কবিতার টানেই ঢাকায় আসা। শুরুটা কঠিন—স্থায়ী ঠিকানা নেই, কাজ নেই। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া দিন, কখনো কোনো সংগঠনের অফিসে রাত কাটানো। তিন বছর ফ্রিল্যান্সিংয়ের পর ২০০৭ সালে সাংবাদিকতায় পা রাখেন। ‘যায়যায়দিন’, ‘সমকাল’সহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় এক দশক কাজ করেন, মূলত বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে।

কিন্তু একসময় বুঝতে পারেন—সংবাদ লেখার ভিড়ে নিজের সৃজনশীল তৃপ্তি হারাচ্ছেন। ২০১৭ সালে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরোপুরি গীতিকার হওয়ার পথে হাঁটেন।

‘ঘুড়ি’ থেকে ‘ঈশ্বর’: গীতিকার হিসেবে উত্থান

গানের কথা লেখা শুরু হয়েছিল কবিতারই এক সম্প্রসারণ হিসেবে। বন্ধু লুৎফর হাসানের সঙ্গে আড্ডার দিনগুলোতে লেখা হয় বহু গান। ২০১১ সালে লুৎফর হাসানের অ্যালবাম ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’—এই গানই তাঁকে পরিচিত করে তোলে গীতিকার হিসেবে। ইউটিউবে কোটি মানুষের শোনা এই গান আজও এক প্রজন্মের নস্টালজিয়া।

টেলিভিশন নাটকে তাঁর বড় সাফল্য আসে ‘বড় ছেলে’ নাটকের গান ‘তাই তোমার খেয়াল’ দিয়ে। এরপর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ ওয়েব ফিল্মের গান ‘রূপকথার জগতে’—যা এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল ব্যবহৃত।

সবচেয়ে বড় আলো আসে শাকিব খান অভিনীত সিনেমা ‘প্রিয়তমা’-র গান ‘ঈশ্বর’ দিয়ে। প্রিন্স মাহমুদের সুরে, রিয়াদের কণ্ঠে গানটি তাঁকে এনে দেয় ২০২৩ সালের বিএফডিএ সেরা গীতিকার পুরস্কার।

উল্লেখযোগ্য কাজ ও স্বীকৃতি (সংক্ষেপে)

ক্ষেত্রতথ্য
জনপ্রিয় গানঘুড়ি, ঈশ্বর, তাই তোমার খেয়াল, রূপকথার জগতে
মাধ্যমঅ্যালবাম, নাটক, ওয়েব ফিল্ম, সিনেমা
পুরস্কারবিএফডিএ, সিজেএফবি, ব্লেন্ডার’স চয়েস
কবিতার বইকিছুটা উপর থেকে মানুষ দেখতে ভালো লাগে (২০২৩)

জনপ্রিয়তার চেয়ে শব্দের দায়

দুই শতাধিক গান লিখেও সোমেশ্বর অলি প্রচারের আলোয় থাকতে চান না। তাঁর বিশ্বাস—গানের আসল শক্তি জনপ্রিয়তায় নয়, লাইনের ওজনে। ট্রেন্ডের পেছনে ছোটা নয়, বরং ভাষার শুদ্ধতা আর অনুভূতির গভীরতাই তাঁর লেখার মূল ভিত্তি।

আজ তাঁর জন্মদিনে কোনো জাঁকজমক আয়োজন নেই। কিন্তু কোথাও না কোথাও কেউ হয়তো আবার গুনগুন করে উঠছেন—
“ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো…”
আর সেই গানের মধ্য দিয়েই নীরবে, অব্যক্তভাবে, শ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে থাকছেন সোমেশ্বর অলি।