চৈতী । উপশাস্ত্রীয় গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

চৈতী (Chaiti বা Chaita) হলো উত্তর ভারতের এক জনপ্রিয় উপশাস্ত্রীয় গীতধারা, যা বসন্তঋতু ও ধর্মীয় অনুভূতির অপূর্ব সংমিশ্রণ। এটি মূলত ভোজপুরি অঞ্চল থেকে উদ্ভূত এবং হিন্দু পঞ্জিকার চৈত্র মাস (মার্চ–এপ্রিল)-এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। চৈত্র মাসেই পালিত হয় শ্রী রামনবমী—ভগবান রামের জন্মোৎসব—আর এই সময়েই চৈতীর গানের প্রধান অনুরণন শোনা যায়।

চৈতী হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের “লাইট ক্লাসিকাল” বা উপশাস্ত্রীয় ধারার অন্তর্ভুক্ত হলেও এর প্রাণ নিহিত আছে গ্রামবাংলা তথা ভোজপুরি লোকসংস্কৃতিতে। একে বলা যায়—লোকধারার হৃদয়রস ও শাস্ত্রীয় সংগীতের শাস্ত্রশুদ্ধতার মিলনে জন্ম নেওয়া এক সুমধুর সংগীতরূপ।

উৎপত্তি ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

চৈতী গানের উদ্ভব ভোজপুর অঞ্চলে, যা বর্তমানে পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিম বিহার জুড়ে বিস্তৃত। এই ধারার নামকরণ হয়েছে হিন্দু মাস “চৈত্র” থেকে—যে মাস বসন্তের আগমন, ফসল কাটার আনন্দ ও ধর্মীয় উৎসবের আবহ নিয়ে আসে।

এই সময়ের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রধান অনুভূতি—

  • কৃষিসংশ্লিষ্ট আনন্দ ও প্রকৃতির সজীবতা
  • ধর্মীয় আবেগ ও ভগবান রামের স্মরণ

গ্রামাঞ্চলে চৈতী গান শরু হতো ধর্মীয় উৎসব, মেলা, বিয়ে ও সামাজিক সমাবেশে। দিনভিত্তিক গ্রামীণ জীবনের নানা পর্যায়ে—মেয়েরা জল আনতে যেতে যেতে বা ধান ভানতে ভানতে—এই গান গুনগুন করে গাইতেন।

কালের প্রবাহে এই লোকগীতি ধীরে ধীরে শাস্ত্রীয় সংগীতের ছায়ায় পরিশীলিত হয়ে ওঠে এবং একটি সুসংহত উপশাস্ত্রীয় ধারায় রূপ নেয়।

সঙ্গীতগত বৈশিষ্ট্য

রাগ ও স্বরবিন্যাস

চৈতীর গানের সুর সাধারণত বসন্তঘেঁষা কয়েকটি রাগে আবদ্ধ থাকে, যেমন—

  • খাম্বাজ
  • ভৈরবী
  • কাফি
  • পিলু

এই রাগগুলো ভক্তিরস, কোমলতা ও উৎসব-উচ্ছ্বাস প্রকাশে বিশেষভাবে উপযোগী।

তাল ও গতি

চৈতী গানে সাধারণত মাঝারি থেকে দ্রুত লয়ের তাল ব্যবহৃত হয়। বহুল ব্যবহৃত তালগুলো হলো—

  • ত্রিতাল (১৬ মাত্রা)

  • কাহারবা (৮ মাত্রা)

  • দাদরা (৬ মাত্রা)

এই তালের ছন্দময়তা চৈতী গানে এক ধরনের লোকজ উচ্ছ্বাস ও প্রাণচাঞ্চল্য যোগ করে।

কথা ও ভাববস্তু

চৈতী গানের ভাষা মূলত ভোজপুরি, আওয়াধি ও পূর্ব-হিন্দি উপভাষাভিত্তিক। গানের বিষয়বস্তু চারটি মূল ধারায় বিভক্ত—

ভক্তিভাব
  • রাম ও সীতার গুণকীর্তন
  • রামায়ণের কাহিনির অংশবিশেষ
  • ঈশ্বরপ্রেমের প্রকাশ
ঋতুভিত্তিক বর্ণনা
  • বসন্তের আগমন
  • আমের মুকুল
  • কোকিলের ডাক
  • ফুল ও নতুন পত্রপল্লব
প্রেম ও বিরহ
  • নারী–পুরুষের প্রেম
  • মিলন ও বিচ্ছেদের যন্ত্রণা
  • কৃষ্ণ–রাধাকে প্রতীক করে রোমান্টিক ব্যঞ্জনা
সামাজিক প্রেক্ষাপট
  • গ্রামীণ জীবনের চিত্র
  • কৃষিকাজ
  • সমাজের দৈনন্দিন অনুভূতি

 

 

পরিবেশনা রীতি

লোকরূপে চৈতী

গ্রামাঞ্চলে এ গান পরিবেশিত হতো খোলা মঞ্চে অথবা মন্দির-প্রাঙ্গণে। দোলক ও মঞ্জিরার মতো সরল যন্ত্রের সঙ্গেই এই সঙ্গীতের পরিবেশনা হতো।

শাস্ত্রীয় রূপে চৈতী

পরবর্তীকালে শাস্ত্রীয় শিল্পীদের হাতে চৈতী পায় পরিশীলিত রূপ—

  • তবলা, হারমোনিয়াম, সরঙ্গি, বেহালা ব্যবহার
  • ‘মীন্ড’, ‘মুর্কি’, ‘গমক’-এর মতো অলংকার
  • রাগভিত্তিক বিস্তার
  • কনসার্ট মঞ্চে পরিবেশনা

তবে এই পরিশীলনের মধ্যেও চৈতীর লোকজ আবেগ অক্ষুণ্ণ থাকে।

আঞ্চলিক বৈচিত্র্য

চৈতীর রূপ অঞ্চলভেদে ভিন্ন—

  • পূর্ব উত্তরপ্রদেশ – রামভক্তিভিত্তিক বিস্তৃত কাহিনি
  • বিহার – অধিক লোকঘেঁষা ও ছন্দময়
  • বারাণসী – শাস্ত্রীয় পরিশীলন সর্বাধিক (বেনারস ঘরানা)

 

 

বিশিষ্ট শিল্পীরা

চৈতীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

গিরিজা দেবী

চৈতীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে বিবেচিত। তাঁর মাধ্যমে চৈতী আন্তর্জাতিক মর্যাদা পায়।

Shobha Gurtu

ভক্তিভাবনায় সমৃদ্ধ চৈতী পরিবেশনায় প্রসিদ্ধ।

Chhannulal Mishra

ভোজপুরি ঐতিহ্য রক্ষা করে শাস্ত্রীয় পরিমণ্ডলে চৈতী উপস্থাপক।

আধুনিক শিল্পীরা

  • মালিনী অবস্থি
  • শুভা মুদগল

 

 

ঋতুগীতি পরিবারের অংশ

চৈতী “ঋতুগীতি” ধারার অন্তর্গত। এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—

  • হোরি (হোলির গান)
  • কাজরি (বর্ষাবন্দনা)
  • সাওয়ানি (বর্ষা ও নারীভাব)

একত্রে এই গীতিগুলো গ্রামীণ জীবনের অনুভূতি ও প্রকৃতির পরিবর্তনের সংগীতচিত্র এঁকে দেয়।

আধুনিক সময়ে চৈতীর অবস্থা

বর্তমানে গ্রামজীবনের রূপান্তর ও শহরমুখী জীবনের কারণে চৈতীর পরিবেশনা কিছুটা কমেছে। তবে নতুন উদ্যোগে এ ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে—

  • Sangeet Natak Akademi কর্তৃক আয়োজিত চৈতী উৎসব
  • সংগীত বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত
  • ডিজিটাল রেকর্ডিং ও আর্কাইভ
  • ফিউশন ব্যান্ডের নতুন প্রয়াস
  • রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচার

 

চৈতী কেবল একটি গানের ধরন নয়—এ হলো বসন্তের সংগীত, ঈশ্বরপ্রেমের বাণী ও গ্রামের জীবনের আত্মকথা। লোকজ আবেগ ও শাস্ত্রীয় সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে চৈতী আজও শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে কেবল একটি ধারাকে বাঁচানো নয়—বরং শতাব্দীপ্রাচীন সংস্কৃতি ও মানুষের অনুভূতিকে ভবিষ্যতের জন্য টিকিয়ে রাখা। চৈতী তাই সংগীত নয়—চৈতী এক ঋতুর হৃদয়।