২ অক্টোবর ২০২৫ ভোররাতে বারাণসির মাটিতে নিভে গেল ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের এক মহান প্রদীপ। প্রয়াত হলেন পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র—যিনি কেবল একজন গায়কই ছিলেন না, ছিলেন হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জীবন্ত ঐতিহ্য, বেনারস ঘরানার এক প্রধান দিকপাল, আর ঠুমরি গানের পূরব আঙ্গিকের এক অসামান্য সাধক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
Table of Contents
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
১৯৩৬ সালের ৩ আগস্ট উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার হরিহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ছান্নুলাল মিশ্র। তাঁর বাবা বদ্রী প্রসাদ মিশ্রও ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ, আর সেই পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর সঙ্গীতের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে তিনি কিরানা ঘরানার উস্তাদ আবদুল ঘনি খানের কাছে তালিম নেন এবং পরে ঠাকুর জয়দেব সিংহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই দীর্ঘ সাধনার পথেই তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন খেয়াল, দাদরা, চৈতি, কজরি, হোলি এবং সর্বোপরি ঠুমরীর এক অমোঘ শিল্পী।
সঙ্গীতজীবন ও অবদান
পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র ছিলেন বেনারস ঘরানার প্রতিনিধিত্বকারী গায়ক, যাঁর গানে লোকসংস্কৃতি, ভক্তি, রস ও শাস্ত্রীয় শৃঙ্খলার অনন্য মিশেল পাওয়া যেত। খেয়াল গানে তাঁর দখল যেমন ছিল অদ্বিতীয়, তেমনি পূরব আঙ্গ ঠুমরীর আবেগময় পরিবেশনায় তিনি শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে “বোল বানাও ঠুমরি” যেন জীবন্ত হয়ে উঠত—যেখানে শব্দের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো সুরের অনন্ত মাধুর্য।
তিনি শুধু কনসার্টেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। সমৃদ্ধ করেছেন ডিসকোগ্রাফিও। “রামচরিতমানস”, “কবীর”, “সুন্দরকাণ্ড”, “শিব বিবাহ”, “হোলি কে রং – টেসু কে ফুল”, “পুরবইয়া চৈতি”, “পুরবইয়া কজরি” থেকে শুরু করে “স্পিরিট অফ বেনারস”—প্রতিটি অ্যালবামই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া “মোহল্লা আষি” ছবির শিরোনাম সংগীত কিংবা “আরক্ষণ” ছবির গানও তাঁকে জনপ্রিয়তার নতুন পরিসরে পৌঁছে দেয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
শিরোমণি পুরস্কার, সুর সিংগার সংসদ, মুম্বাই
উত্তরপ্রদেশ সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার
নওশাদ পুরস্কার (উ. প্র.)
যশভারতী পুরস্কার (উ. প্র.)
সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ (ভারত সরকার)
বিহার সঙ্গীত শিরোমণি পুরস্কার
২০০০ সালে তিনি পান সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। ২০১০ সালে তাঁকে প্রদান করা হয় পদ্মভূষণ, আর ২০২০ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ-এ ভূষিত হন।
ব্যক্তিগত জীবন
তিনি ছিলেন প্রখ্যাত তবলা বাদক পণ্ডিত অনোখেলাল মিশ্রের জামাতা। পরিবার ও শিষ্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন সঙ্গীতের উত্তরাধিকার। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর কন্যা নম্রতা মিশ্র নিয়মিত তাঁর সঙ্গীতচর্চার পাশে ছিলেন।
প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র। কিডনির জটিলতা, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন এবং অস্থিসংক্রান্ত সমস্যায় তিনি ভুগছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, শেষ পর্যন্ত আর রক্ষা হলো না। ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর, বারাণসিতে তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীতজগত শোকস্তব্ধ। তাঁর গানের ধারা, আবেগময় ঠুমরি পরিবেশনা, ভক্তিমূলক সংগীতচর্চা এবং অমর রেকর্ডিং—সবই চিরকালীন উত্তরাধিকার হয়ে বেঁচে থাকবে। পণ্ডিত ছান্নুলাল মিশ্র শুধু একজন সঙ্গীতশিল্পী নন, ছিলেন গঙ্গাতীরের বেনারসের আত্মা—যাঁর সুরে শোনা যেত ভারতের শাশ্বত সংস্কৃতির অনুরণন।
