জগজিৎ সিং-এর ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ: গজলের চিরন্তন কণ্ঠ

আজ আমরা স্মরণ করছি এবং উদ্‌যাপন করছি কিংবদন্তি গজলসম্রাট জগজিৎ সিং-এর জন্মদিন—যার কণ্ঠ উপমহাদেশের সঙ্গীতভুবনকে নতুনভাবে রূপ দিয়েছিল এবং উর্দু কবিতার চিরন্তন সৌন্দর্যকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। খুব কম শিল্পীই কবিতাকে এতটা ব্যক্তিগত, অন্তরঙ্গ এবং তাৎক্ষণিক অনুভূতির মতো করে তুলতে পেরেছেন; জগজিৎ সিং সেই কাজটি করেছিলেন এক অসাধারণ স্বাভাবিকতা ও মাধুর্যে, যা আজও তার প্রয়াণের বহু বছর পরেও সমানভাবে অনুরণিত হয়।

জগজিৎ সিং

১৯৪১ সালে রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে জন্ম নেওয়া জগজিৎ সিং এমন এক পরিবেশে বড় হন, যেখানে সঙ্গীত ছিল একই সঙ্গে সাধনা ও শৃঙ্খলা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে এমন একটি গায়কীভঙ্গি গড়ে তোলেন, যা শাস্ত্রীয় গভীরতা এবং আধুনিক গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য সমন্বয়। এক সময় গজল ছিল মূলত অভিজাত আসর ও ঐতিহ্যবাহী মেহফিলের সীমাবদ্ধ শিল্পরূপ; জগজিৎ সিং সেটিকে সাহিত্যিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই সাধারণ মানুষের প্রিয় ও জনপ্রিয় ধারায় পরিণত করেন। তিনি নরম অর্কেস্ট্রেশন, আধুনিক সংগীতায়োজন এবং কথোপকথনের মতো স্বাভাবিক গায়নভঙ্গি ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের কাছে গজলকে সহজ করে তোলেন।

জগজিৎ সিং

চিত্রা সিং-এর সঙ্গে তার যুগলবন্দি দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীত ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ও স্মরণীয় অংশীদারিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁদের যৌথ অ্যালবামগুলো একটি পুরো যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছে, যেখানে মির্জা গালিব, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সুদর্শন ফকিরসহ অসংখ্য কবির কবিতা মানুষের দৈনন্দিন আবেগের ভাষায় জায়গা করে নেয়। “হোঁঠোঁ সে ছুঁ লো তুম”, “ঝুঁকি ঝুঁকি সি নজর”, “তুম এতনা জো মুসকুরা রহে হো”—এসব গান আর কেবল সংগীত রচনা নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভাগাভাগি স্মৃতি—নিঃসঙ্গতা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমগ্নতার সঙ্গী হয়ে থাকা সুর।

জগজিৎ সিং

জগজিৎ সিং-এর শিল্পের শক্তি শুধু তার কণ্ঠের সৌন্দর্যে নয়, শব্দের প্রতি তার গভীর সংবেদনশীলতায়ও নিহিত ছিল। তিনি বুঝতেন, গজল আসলে কবিতা ও নীরবতার এক অন্তরঙ্গ সংলাপ। তার বিরতি, সংযত উচ্চারণ এবং উষ্ণ ব্যারিটোন কণ্ঠ প্রতিটি শব্দকে শ্বাস নেওয়ার জায়গা দিত। কণ্ঠের কৌশল প্রদর্শনের মাধ্যমে কবিতাকে আড়াল না করে তিনি ধীরে ধীরে অর্থের স্তর উন্মোচন করতেন, ফলে শ্রোতার কাছে গানটি হয়ে উঠত যেন এক ব্যক্তিগত আলাপচারিতা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন—অতিরঞ্জিত প্রকাশের চেয়ে সংযমই অধিক শক্তিশালী, এবং আবেগের সত্য সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ পায় সরলতার মধ্য দিয়েই।

জগজিৎ সিং

গজল সংগীতের আধুনিকীকরণেও তার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অ্যালবামগুলো উচ্চমানের স্টুডিও প্রযুক্তি ও যত্নসহকারে নির্মিত সংগীতায়োজন ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে, যা একই সঙ্গে শাস্ত্রীয় অনুরাগী ও আধুনিক শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই সেতুবন্ধনই নিশ্চিত করেছে যে গজল কোনো অতীতমুখী স্মৃতিচিহ্ন হয়ে না থেকে একটি জীবন্ত সংগীতধারা হিসেবে টিকে থাকবে।

জগজিৎ সিং

মঞ্চের বাইরে জগজিৎ সিং ছিলেন বিনয়ী, উদার এবং সহশিল্পী ও কবিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল একজন মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কঠিন শোক ও বেদনার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু সেই গভীর ক্ষতির মধ্যেও তিনি নীরব দৃঢ়তায় আবার সঙ্গীতে ফিরে এসেছেন এবং আরও গভীর আবেগে ভরা পরিবেশনা উপহার দিয়েছেন। অসংখ্য শ্রোতার কাছে তার গান শোকের সময়ে সান্ত্বনা এবং নিঃসঙ্গতার সময়ে সঙ্গীর মতো হয়ে উঠেছে।

জগজিৎ সিং

তার প্রয়াণের এক দশকেরও বেশি সময় পর আজও জগজিৎ সিং-এর কণ্ঠ দক্ষিণ এশিয়া ও প্রবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক চেতনায় জীবন্ত। নতুন প্রজন্মের গায়করা তার গায়নভঙ্গি থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন, কবিরা তার পরিবেশনার মাধ্যমে নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছেন, আর শ্রোতারা আবিষ্কার করছেন—তার গান সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না, বরং আরও পরিণত হয়ে ওঠে। তার সংগীত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গজল কেবল একটি সংগীতধারা নয়; এটি অনুভূতির এক পরিশীলিত ভাষা, যা মৃদুস্বরে কথা বলেও মানুষের হৃদয়ের গভীরতম স্থানে পৌঁছে যায়।

জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং

তার জন্মদিনে আমরা জগজিৎ সিং-কে শুধু একজন মহান কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নয়, বরং কবিতার এক নিবেদিত অভিভাবক, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন, এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সমষ্টিগত স্মৃতিতে রূপান্তরিত করা এক অসামান্য শিল্পী হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তার সুর আজও চিরকালীন, তার ব্যাখ্যা অনন্য, এবং তার উত্তরাধিকার দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীত ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে—যেখানে কবিতা ও সঙ্গীতের মিলন ঘটলেই তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হবে।