জয়া আহসানের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ এবার ঘরে বসেই দেখুন

ভারতবর্ষ সাময়িকীতে ১৯৩৪-৩৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। ৯০ বছর পর, সেই উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সিনেমা। গত আগস্ট মাসে পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল পুতুলনাচের ইতিকথা; এবার তা আসছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। ঘরে বসেই দেখা যাবে সুমন মুখোপাধ্যায়ের এই সিনেমাটি।

১৪ নভেম্বর থেকে সিনেমাটি হইচই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাবে। প্ল্যাটফর্মটির ফেসবুক পোস্টে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে পর্দায় কুসুম, শশী, কুমুদ, যাদব ও সেনদিদির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান, আবীর চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় ও অনন্যা চট্টোপাধ্যায়।

অনেকদিন ধরেই সিনেমাটি নিয়ে কাজ করছিলেন পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়। সিনেমার মুক্তির আগে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “এই ছবি বানানোর প্রথম চেষ্টা করেছিলাম ২০০৮ সালে। কিন্তু নানা কারণে আটকে গিয়েছিল। যখন ১৪ বছরেও বানাতে পারিনি, তখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যদার যুদ্ধ পরিস্থিতি উপন্যাসের একটা লাইন আমাকে আবার তাতিয়ে তুলল… ‘হতাশ আর ভগ্নোদ্যম সেসব মানুষ পুতুলের যান্ত্রিক জীবনের অপরূপ কাহিনি ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’।’ মনে হলো, এটা তো আমাদের সময়ের কথা। আবার উঠে পড়লাম। ২০২২-এ শুটিং শেষ করলেও তিন বছরের বেশি সময় লেগে গেল ছবিটি শেষ করতে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে।”

নির্মাতা আরো জানান, উপন্যাস থেকে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্যে, “ভারতের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়কে ফ্রেমবন্দি করেছি। মূল উপন্যাসে সময়টা আরও পেছনে ছিল, আমি খানিকটা এগিয়ে এনেছি। তা ছাড়া উপন্যাসের সবকিছু ছবির চালচিত্রে ধরানো সম্ভব নয়। দুটো মাধ্যমের চলন আলাদা। আমি চারিত্রিক রসায়নের ওপর বেশি জোর দিয়েছি।”

সিনেমার ট্রেলারটি শুরু হয় শশী (আবীর চট্টোপাধ্যায়) চরিত্রের মাধ্যমে, যে শহুরে জীবনের হাতছানি এড়িয়ে গ্রামে ডাক্তারি করার আক্ষেপে জর্জরিত। শশীর মনের মধ্যে রয়েছে গ্রামের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করার ইচ্ছা, কিন্তু সে সব ইচ্ছা কোনো দিন পূর্ণ হতে পারে না। একঘেয়েমি কাটানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তার জীবনে আসে কুসুম (জয়া আহসান), এবং এই চরিত্রের আবির্ভাবই সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নির্মাতা আরো জানান, “উপন্যাস নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন, অনেক লেখালিখিও হয়েছে। ‘শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’ এই সংলাপ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু এই সংলাপ কি শশীর, নাকি মানিকের নিজের, তা উপন্যাসে স্পষ্ট নয়। তবে চিত্রনাট্যে এটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।”

কুসুম চরিত্রটি নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকাকে জয়া আহসান বলেন, “বরাবর নারীকেই কামনা ও বাসনার বস্তু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু কুসুমেরও নিজের কামনা-বাসনা রয়েছে, যা সে লুকোয় না। কুসুম একটা খোলা বইয়ের মতো। কুসুমের মন, শরীর ও আত্মা সব এক রকম। এখানেই শশীর সঙ্গে তার পার্থক্য। কুসুম কিন্তু শশীর চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখে। সে এতটাই খোলা মনের, সতেজ একটি চরিত্র।”

জয়া আরও জানান, অনেক আগে শুটিং করলেও কুসুম এমন একটি চরিত্র যা এখনও তার ভেতরে রয়ে গেছে। পর্দায় শশীর ভাষ্য, “কুসুমের মধ্যে কোনো জড়তা নেই। আমাদের সবার মধ্যে একটা লক্ষ্মণরেখা থাকে। এটা কুসুমের মধ্যে নেই বলেই সে এত আধুনিক। আমি নিজেও কুসুমের মতো হতে পারব না। এই গ্রামবাংলার বাউলদের কথাই যদি বলা যায়, তাঁদের দেহ, মন, আত্মা সব মিলেমিশে একাকার।”

শশী একদিকে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানে বিশ্বাসী; অন্যদিকে তার মধ্যে দ্বন্দ্বও রয়েছে। দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে সে। আবীর চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বাঙালিদের মধ্যে একধরনের সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। এই একই বৈশিষ্ট্য শশীর মধ্যেও রয়েছে। তবে আমি ভাগ্যবান যে এমন একটি চরিত্র করতে পেরেছি।”

ছবির আরেক অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় জানান, স্রেফ একটি দৃশ্যের জন্যই তিনি সিনেমাটি করতে রাজি হয়েছেন। ছবিতে একটি পালাগানের দৃশ্য রয়েছে, যা পর্দায় হলেও যাত্রাপালার অংশ হওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি তিনি।

তবে সিনেমাটির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা অনেকদিন ধরেই চলছে, এবং এটি নিশ্চিত যে পুতুলনাচের ইতিকথা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৪ নভেম্বর থেকে হইচই-তে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।