ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা কেন্দ্র (টিএসসি)–এর পায়রা চত্বরে সোমবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদী আয়োজন—“প্রতিবাদী বাউল সন্ধ্যা”। সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পীদের ওপর সংঘটিত হামলার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগেই এই আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়।
Table of Contents
সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের একাত্মতা
অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মনোয়ার হোসেন প্রান্তো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হল চট্টগ্রা দল ইউনিটের সমন্বয়ক। তাঁর সঙ্গে টিএসসি-কেন্দ্রিক নানা সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে যুক্ত হন। সন্ধ্যা নামতেই পায়রা চত্বর পরিণত হয় গান, কবিতা, বক্তব্য ও প্রতিবাদের এক গণমঞ্চে। বাউল গান, প্রতিবাদী সঙ্গীত এবং মুক্তচিন্তার কবিতা—সবকিছু মিলিয়ে এ আয়োজনে ফুটে ওঠে বাংলার মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
বাউল দর্শনের গুরুত্ব তুলে ধরলেন আয়োজকরা
বক্তব্যে মনোয়ার হোসেন প্রান্তো বলেন—
“বাউল দর্শন বঙ্গের লোকসংস্কৃতির প্রাণ। এটি মানবতা, সমতা ও মুক্তচিন্তার বার্তা বহন করে। যারা বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা করেছে, তারা শুধু একজন শিল্পীকে আঘাত করেনি; তারা আক্রমণ করেছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহাসিক সহিষ্ণুতাকে।”
তিনি আরও জানান, বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ানোর এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত; তাই এই মুহূর্তে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
অন্য আয়োজক ফারদৌস সিদ্দিকী সায়মন, স্যার এ.এফ. রহমান হল চট্টগ্রা দল ইউনিটের সমন্বয়ক, বলেন—
“সংস্কৃতি, শিল্প ও মতপ্রকাশের ওপর আঘাত কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাধীনতা–পরবর্তী বাংলাদেশ বহুসংস্কৃতির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে; ধর্মীয় উগ্রতা নয় বরং মানবিকতা একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।”
আবিদ-উর-রহমান মিশু, সূর্য সেন হল চট্টগ্রা দল ইউনিটের সদস্য সচিব, বলেন—
“বাউল দর্শন কেবল একটি শিল্পধারা নয়—এটি মানুষের ভেতরের আলোকিত হওয়ার পথ। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি—সবাইকে একসঙ্গে এই মানবিক দর্শন রক্ষায় দায়িত্ব নিতে হবে।”
গান-কবিতা-প্রতিবাদে মুখর পায়রা চত্বর
আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাউল গান, প্রতিবাদী গান, স্লোগান ও কবিতা পরিবেশন করেন। অনেক দর্শক হাতে হাতে প্রদীপ, পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে জানান তাঁদের পক্ষপাতহীন অবস্থান—“সংস্কৃতির ওপর আঘাত মানে মানবতার ওপর আঘাত।”
কার্যকর দাবি
এই সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ থেকে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়, যা বাউল শিল্পীদের নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় জরুরি হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবাদী দাবিসমূহ (সংক্ষেপে)
| ধারাবাহিক | দাবি |
|---|---|
| ১ | বাউল শিল্পীদের ওপর হামলার দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত |
| ২ | হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা |
| ৩ | বাউলসহ সকল সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ |
| ৪ | ঘৃণা, উস্কানি ও সহিংসতা রোধে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ |
একটি স্পষ্ট বার্তা
“প্রতিবাদী বাউল সন্ধ্যা” শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের প্রজন্ম–ঘোষণা। তারা জানিয়ে দিলেন,
সংস্কৃতি, শিল্প ও মানবিকতার ওপর আঘাত তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।
বাংলার বাউল দর্শন ও মানবতাবাদী ঐতিহ্য রক্ষায় তরুণদের এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বাংলাদেশের সমাজ–চিন্তায় ইতিবাচক প্রতিধ্বনি তুলবে—এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
