তিমিরবরণ ভট্টাচার্য (ইংরেজিতে Timir Baran Bhattacharya, জন্ম: ১০ জুলাই, ১৯০৪; মৃত্যু: ২৯ মার্চ, ১৯৮৭) ছিলেন একজন অসাধারণ বাঙালি সরোদবাদক, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং ভারতীয় অর্কেস্ট্রার প্রাণপুরুষ। তাঁকে আধুনিক ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে “Father of Indian Symphony Orchestra” বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর হাতে সরোদ যন্ত্রটি, যা বিশ শতকের প্রথম দশকে ভারতে মাত্র ছয়জন বাদকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, একটি অপরিচিত যন্ত্র থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতির প্রতীক হয়ে ওঠে। তিনি থিয়েটারের প্রভাব থেকে মুক্ত করে ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছেন এবং পশ্চিমা যন্ত্রের সঙ্গে ভারতীয় রাগ-রাগিনীর অভিনব মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভারতীয় অর্কেস্ট্রার জন্মদাতা হিসেবে আজও পরম শ্রদ্ধেয়। তাঁর সৃষ্টি কেবল সঙ্গীতের সীমানায় নয়, বরং নৃত্যনাট্য, ব্যালে এবং চলচ্চিত্রের জগতেও বিপ্লব ঘটিয়েছে। তাঁর নাম আজও সঙ্গীতজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্মরণীয়।

Table of Contents
তিমিরবরণ ভট্টাচার্য | সরদ বাদক, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক
জন্ম, বংশ পরিচয় এবং পারিবারিক পরিবেশ
তিমিরবরণ ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯০৪ সালের ১০ জুলাই কলকাতার বড়বাজারের শিবঠাকুরের গলির ৩১ নম্বর বাড়িতে। তাঁর পরিবার ছিল প্রাচীন তন্ত্রসাধক ও সংস্কৃত পণ্ডিতের পরিবার। পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ এবং তান্ত্রিক সাধক। ভট্টাচার্য পরিবারের খ্যাতি তখন সঙ্গীতের চেয়ে তান্ত্রিক সাধনমার্গের জন্যই বেশি ছিল। পাথুরিয়াঘাটার রাজপরিবার ছিলেন তাঁদের মন্ত্রশিষ্য। এই বাড়িতে আসতেন বিখ্যাত ধ্রুপদশিল্পী আশুবাবু, পাখোয়াজশিল্পী নগেন দেব, খেয়ালশিল্পী রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী প্রমুখ। এই পরিবেশে তিন ভাই—জ্যেষ্ঠ মিহিরকিরণ, মধ্যম তিমিরবরণ এবং কনিষ্ঠ শিশিরশোভন—ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের স্পর্শ পান। দাদা মিহিরকিরণ বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহের নেশায় মগ্ন ছিলেন, যা তিমিরবরণের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। খুব অল্প বয়সে পিতৃহারা হওয়ায় দাদাকেই তিনি পিতৃসম জ্ঞান করতেন এবং দাদার সঙ্গীতচর্চা তাঁর জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক সঙ্গীত চর্চা
তিমিরবরণের পড়াশোনা শুরু হয় ওরিয়েন্টাল সিভিল স্কুল এবং সিটি ট্রেনিং স্কুলে। ১৯১৫ সালে ক্ল্যারিওনেটশিল্পী রাজেন্দ্রলাল চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিতে শুরু করেন। পরে রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর কাছেও ভোকাল মিউজিক শেখেন। কিন্তু তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট আসে যখন তিনি ব্যাঞ্জো সারাতে চিৎপুর রোডের বাজনার কারিগর গোবর্ধনের কাছে যান। গোবর্ধন হেসে বলেন, “বাবু, এ সব খেলনা যন্ত্র কেউ বাজায় নাকি? আপনি বরং সরোদ বাজান!” এই কথায় তিনি অবাক হন, কারণ সরোদের নামও তখনও তিনি শোনেননি। দাদা মিহিরকিরণকে সঙ্গে নিয়ে দোকানে গিয়ে সরোদ দেখেন এবং তার আওয়াজ শুনে মুগ্ধ হন। তখন ভারতে মাত্র ছয়জন সরোদ বাজাতেন—ফিদা হুসেন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, আবদুল্লা খাঁ, হাফিজ আলি খাঁ, করমতুল্লা খাঁ এবং আমির খাঁ। এই ঘটনা তাঁর জীবনের দিক পরিবর্তন করে দেয়।
তিমিরবরণ গোঁ ধরেন সরোদ শিখবেন। গোবর্ধন তাঁকে আমির খাঁর কাছে নিয়ে যান, যিনি মেছোবাজারে থাকতেন। প্রথমে সপ্তাহে দু’দিন শেখার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর আকুলতা ও অধ্যবসায় দেখে আমির খাঁ রোজ দু’বেলা শেখাতে শুরু করেন। পাঁচ বছর ধরে এই তালিম চলে। তাঁর নাতনি রঞ্জনী সরকারের স্মৃতিচারণে জানা যায়, “বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত তালিম চলত। মাঝে শিষ্যই তামাক সাজিয়ে দিতেন। আমির খাঁ নিজের সরোদটিও রেখে যান শিষ্যের বাড়িতে।” বৃষ্টির দিনেও কলকাতা শহর বুক সমান জলে ভাসলেও ওস্তাদজি টোকা দিতেন দরজায়।
১৯২৫ সালে গৌরীপুরের রাজবাড়িতে মাইহার থেকে আসা বাবা আলাউদ্দিন খাঁর সরোদবাদন শুনে তিনি মুগ্ধ হন। সরাসরি বাবাজির কাছে শিখতে চান। প্রথমে রাজি না হলেও রাজকুমারদের অনুরোধে আলাউদ্দিন খাঁ তাঁকে মাইহারে নিয়ে যান। কলকাতার পাঠ ছেড়ে নির্জন মাইহারে পাড়ি দেন তিমিরবরণ। প্রথমে ওস্তাদজির বাড়িতে থাকেন, পরে মহারাজা মন্দিরে ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে ইকমিক কুকারে রান্না করতেন, প্রতি মাসে দাদাকে কুড়ি টাকা পাঠাতেন। আলাউদ্দিন খাঁ একবার মাত্র ১৫ মিনিট বাজিয়ে শোনাতেন, তা মনে রেখে বাজাতে হতো। না হলে হুঁকো হাতে মার জুটত। গ্রীষ্মে রাতভর, শীতে রাত তিনটায় উঠে সাত ঘণ্টা অভ্যাস চলত। এই কঠোর সাধনা তাঁকে একজন অসাধারণ সরোদবাদক করে তোলে।
সঙ্গীত জীবন এবং অবদান
১৯৩০ সালে তিমিরবরণ উদয়শঙ্করের নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ইউরোপ ও আমেরিকা সফরে অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্ট করেন এবং সরোদ সোলো বাজান। এই সময়ে তিনি ভারতীয় যন্ত্রের সঙ্গে পশ্চিমা অর্কেস্ট্রার মেলবন্ধন ঘটান। ১৯৩৪ সালে মধু বোসের ক্যালকাটা আর্ট প্লেয়ার্সের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ‘আলিবাবা’, ‘বিদ্যুৎপর্ণা’ প্রভৃতি নাটকে অর্কেস্ট্রা সুরারোপ করেন। জাভা-বালি ভ্রমণ থেকে জাইলোফোন নিয়ে আসেন এবং ভারতীয় অর্কেস্ট্রায় ব্যবহার করেন।
তিনি নিউ থিয়েটার্সের অন্যতম সঙ্গীত পরিচালক (আর.সি. বরাল ও পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে) হিসেবে ‘দেবদাস’ (১৯৩৫, হিন্দি), ‘অধিকার’ (১৯৩৮), ‘সোহাগ’ (১৯৪০), ‘লক্ষ্মী’ (১৯৪০), ‘ধর্মপত্নী’ (১৯৪১), ‘সমাপ্তি’ (১৯৪৯), ‘বাদবান’ (১৯৫৪), ‘ফঙ্কার’ (১৯৫৬), ‘অনোখি’ (১৯৫৬), ‘জাগো হুয়া সবেরা’ (১৯৫৯) প্রভৃতি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ‘দেবদাস’-এ তাঁর সুরে কে.এল. সায়গালের গান “বলম আও বসো মোরে মন মে” অমর হয়ে ওঠে। তিনি সরোদের অংশ ব্যবহার করে চলচ্চিত্র সঙ্গীতকে নতুন মাত্রা দেন।
তাঁর বিখ্যাত সিম্ফনি রচনা ‘শিশু তীর্থ’ (১৯৩৬) রবীন্দ্রনাথের ‘The Child’ কবিতার উপর ভিত্তি করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মুক্তি সঙ্গ্রাম’ সিম্ফনি রচনা করেন। শান্তিনিকেতনে সঙ্গীত বিভাগে কাজ করেন এবং ১৯৭৯ সালে তাঁর শেষ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তিমিরবরণ ভট্টাচার্য ১৯৫০ সালে ভারত সরকারের সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশিকোত্তম উপাধি পান। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আলাউদ্দিন পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হন।
ব্যক্তিগত জীবন এবং উত্তরাধিকার
তিমিরবরণের স্ত্রী ছিলেন মোনিকা দেবী। তাঁদের পুত্র ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য বিখ্যাত সেতারবাদক হন। তাঁর নাতনি রঞ্জনী সরকার তাঁর জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। তিমিরবরণের সঙ্গীত আজও ভারতীয় অর্কেস্ট্রা, চলচ্চিত্র সঙ্গীত এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রেরণা হয়ে আছে। তাঁর উত্তরাধিকার ২০২৪ সালে ‘শিল্পী তিমিরবরণ’ বই প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করে আলোকিত হয়েছে। তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের এক অমর নাম।
