দেবব্রত বিশ্বাস । ভারতীয় বাঙালি রবীন্দ্রসংগীত গায়ক ও শিক্ষক

দেবব্রত বিশ্বাস এক স্বনামধন্য ভারতীয় বাঙালি রবীন্দ্রসংগীত গায়ক ও শিক্ষক। দেবব্রত বিশ্বাস ভারতের গণনাট্য আন্দোলনেরও অন্যতম পুরোধাপুরুষ ও একজন বিখ্যাত গণসঙ্গীত গায়কও বটে। রাজা‌পঞ্চম জর্জের দিল্লি দরবারে আগমনের অব্যবহিত পূর্বে জন্ম বলে তার ডাকনাম রাখা হয় জর্জ। পরবর্তীকালে অনুরাগীমহলে তিনি জর্জ বিশ্বাস বা জর্জদা নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।

 

প্রারম্ভিক জীবন

দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম ১৯১১ সালের ২২ অগস্ট অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্তর্গত কিশোরগঞ্জে। তার পিতা দেবেন্দ্রমোহন বিশ্বাস। পিতামহ কালীমোহন বিশ্বাস ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে নিজগ্রাম ইটনা থেকে বিতাড়িত হন। শৈশবে কিশোরগঞ্জের বিদ্যালয়ে দেবব্রত সেই কারণে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে বিবেচিত হতেন। শিশুবয়সেই মা অবলা দেবীর মাধ্যমে ব্রহ্মসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে পরিচিত হন। মহেন্দ্র রায়ের কাছে দেশাত্মবোধক গান শেখেন এবং কিশোরগঞ্জের স্বদেশী সভায় অল্পবয়স থেকেই গান গাইতেন।

১৯২৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময় ব্রাহ্মসমাজ ও পরে শান্তিনিকেতনে গান গাইবার আমন্ত্রণ পান। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে। ১৯২৮ সালের ব্রাহ্ম ভাদ্রোৎসবে কলকাতার সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখেন দেবব্রত।

১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন এবং ১৯৩৪ সালে হিন্দুস্থান ইনসিওরেনস কোম্পানিতে বিনা মাইনের চাকরিতে যোগদান করেন। পরের বছর চাকরি পাকা হয় ও বেতন ধার্য হয় ৫০ টাকা। এই চাকরিসূত্রে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার পুত্র সুবীর ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ হয়ে দেবব্রতের। মূলত এঁদেরই সূত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে পদার্পণ করেন দেবব্রত।

১৯৩৮ সালে কনক দাশের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে প্রথম তার রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড। এই সময় থেকে হিজ মাস্টার্স ভয়েস ও অন্যান্য রেকর্ড সংস্থা তার গান রেকর্ড করতে শুরু করে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি গণসঙ্গীত ও অন্যান্য গানও গাইতেন। তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, এই সময় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও তার পরিচয় হয়েছিল এবং নজরুল তার গান শুনে তাকে দুটি শিখিয়ে সেগুলি রেকর্ড করিয়েছিলেন। একটি গান “মোর ভুলিবার সাধনায় কেন সাধো বাদ” অপরটি আত্মজীবনীতে তিনি স্মরণ করতে পারেননি।

 

গান ও চলচ্চিত্রায়ন

মৃত্যুর প্রায় তিনদশক পরেও দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পীরূপে পরিচিত। দেবব্রত বিশ্বাস প্রায় ৩০০ রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেন। তার অন্যান্য রেকর্ডের মধ্যে আছে ‘ত্বমাদিদেব’ ও ‘ত্বমীশ্বরাণাং’ বেদগান, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত ‘তুমি দেবাদিদেব’ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত “অন্তরতর অন্তরতম তিনি যে” ও “প্রণমামি অনাদি অনন্ত” ব্রহ্মসংগীত, কবি বিষ্ণু দে রচিত কবিতার সুরারোপ “কোথায় যাবে তুমি” এবং বেশ কয়েকটি আধুনিক গান।

তবে রবীন্দ্রসংগীতই তার প্রধান সংগীতক্ষেত্র ছিল। তার রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশিষ্ট চলচ্চিত্রায়ণ করেন ঋত্বিক ঘটক। মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে গীতা ঘটকের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে যে রাতে মোর দুয়ারগুলি; কোমলগান্ধার ছবিতে আকাশভরা সূর্যতারা এবং যুক্তি তর্ক ও গল্প ছবিতে স্বয়ং ঋত্বিক ঘটকের ওষ্ঠদানে কেন চেয়ে আছ গো মা গানগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছিল। এছাড়া ঋত্বিক ঘটকের কোমল গান্ধার ছবির একটি ক্ষুদ্র চরিত্রে তিনি অভিনয়ও করেন।

রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া নিয়ে দেবব্রত বিশ্বাসকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়েছে কেননা তার গায়কী বিশেষ করে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রভারতী মিউজিক বোর্ড-এর আপত্তি ছিল। এই বোর্ড রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়ার ব্যাপারে দেবব্রতকে ৬টি শর্ত দিয়েছিলেন, যথাঃ–

(১) (ক) এস্রাজ, বাঁশী, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাসবেহালা বা অর্গান, (খ) পাখোয়াজ, বাঁয়াতবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা।

(২)প্রতি গানের মূল আবেগটির প্রতি লক্ষ্য রেখে অনুকূল আবহসংগীত যন্ত্রে রচনা করে, আরম্ভে এবং যেখানে গায়কের কণ্ঠের বিশ্রাম প্রয়োজন, সেখানে তা প্রয়োগ করতে হবে।

(৩) যে কটি যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, গানের সঙ্গে তার সব কটিকেই বাজান যেতে পারে কিন্তু কোন যন্ত্রটি কিভাবে আবহ সংগীতে বাজবে সংগীত রচয়িতাকে তা স্থির করতে হবে গানের প্রতি ছত্রের ভাবটির প্রতি লক্ষ্য রেখে।

(৪) আবহ সংগীত গায়কের গলার শব্দকে ছাড়িয়ে যাবে না কখনো। কণ্ঠের বিশ্রামের সময় বা গান আরম্ভের পূর্বে যখন যন্ত্রে আবহসংগীত বাজবে তখনও এই দিকটার প্রতি বাজিয়েরা যেন বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখেন।

(৫) তালযন্ত্রের সঙ্গতের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তালের ছন্দ বা বোল যেন কথার ছন্দ ও লয়ের বিপরীত না হয়। অর্থাৎ দ্রুত ছন্দের গানে যেমন দ্রুত লয়ের ঠেকার প্রয়োজন ঢিমালয়ের গানে তেমনি ঢিমালয়ের ঠেকার প্রয়োজনকে মানতেই হবে; এবং

(৬) কথার উপরে ঝোঁক দিয়ে অনেক গান গাইতে হয়। এই সব গানের সঙ্গে সঙ্গতের সময় তালবাদ্যেও কথার ছন্দের অনুকূল ঝোঁক প্রকাশ পাওয়া দরকার। তাতে গানের ভাবের সঙ্গে কথার ভাবের সঙ্গতি থাকে।

– এই শর্তাবলী দেবব্রতের বৈশিষ্ট্যময় সঙ্গীতরীতির অনুকূল ছিল না। তার আত্মজীবনী ব্রাত্যজনের রূদ্ধ সঙ্গীত গ্রন্থে তিনি এই বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন যে, “(এই শর্তাদি পড়ে) রবীন্দ্রসংগীত আর রেকর্ড করবো না বলেই স্থির করেছিলাম। ”

 

মৃত্যু

দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৮০ সালের ১৮ অগস্ট কলকাতাতেই নিজ বাসভবনে দেবব্রত বিশ্বাসের মৃত্যু হয়।

অ্যালবাম

  • পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে — রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান
  • প্রেম এসেছিল- ৩ খণ্ডে
  • যত শুনিয়েছিলেম গান
  • দিগন্তবেলায় শেষের ফসল
  • রাত জাগা মোর গান

Leave a Comment