নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি । বাংলাদেশী সংগীতশিল্পী

নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, যিনি সাধারণত ন্যান্সি নামে পরিচিত, বাংলাদেশের সংগীতজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর মধুর কণ্ঠে রোমান্টিক, আধুনিক এবং প্লেব্যাক গানের অসংখ্য রচনা বাংলাদেশের শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বেতারে শিল্পী হিসেবে যোগদান করে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও, ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পেশাদার স্বীকৃতি লাভ করেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেছেন এবং মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে টানা ছয়বার (কিছু উৎসে সাতবার বা ১৩ বার) শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর গানের সংখ্যা শত শতাধিক, যার মধ্যে হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে দ্বৈত গানগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয়। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ন্যান্সি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রায় এক দশক সংগীতজগতে অনুপস্থিত ছিলেন, কিন্তু ২০২৪-এর পর আবার ফিরে এসে নতুন গান মুক্তি করছেন। তাঁর জীবনী সংগ্রাম, প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি ১৯৮৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর (কিছু উৎসে ১৯৮৮ বা ১৯৮৯) বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার সাতপাই গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। গ্রামীণ পরিবেশে লোকগান ও আধুনিক গান শুনে বেড়ে ওঠা ন্যান্সি স্কুলজীবনে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম স্বীকৃতি লাভ করেন। দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে না পারলেও, তাঁর স্ব-শিক্ষিত মনোভাব এবং কণ্ঠের মিষ্টত্ব তাঁকে সঙ্গীতের পথে এগিয়ে নেয়। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বেতারে (বিবিসি) নজরুলগীতি, লোকগীতি এবং আধুনিক গানে সি-গ্রেড শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এ সময় তিনি মেরিল বিউটি সোপের মতো বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল গেয়ে প্রথম পেশাদার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ন্যান্সির সহজাত প্রতিভা এবং কণ্ঠের আবেগপূর্ণ প্রকাশ তাঁকে দ্রুত সংগীতজগতে আকর্ষণ করে।

সঙ্গীতজীবন: উত্থান ও অবদান

ন্যান্সির পেশাদার যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে ‘হৃদয়ের কথা’ চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গান দিয়ে। একই বছরে বিজ্ঞাপন জিঙ্গেলে অভিষেক হয়। ২০০৮ সালে ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ ছবির গান “পৃথিবীর যত সুখ যত ভালোবাসা” দিয়ে তিনি রাতারাতি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এ গানটি বাংলাদেশের চার্টে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষে ছিল এবং তাঁর কণ্ঠের মাধুর্যের প্রমাণ হয়ে ওঠে। এছাড়া ‘আমার আছে জল’‘চন্দ্রগ্রহণ’ ছবিতে কণ্ঠ দেন।

২০০৯ সালে সংগীতা লেবেল থেকে প্রথম একক অ্যালবাম ‘ভালোবাসা অধরা’ মুক্তি পায়, যা রোমান্টিক থিমভিত্তিক এবং শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে দ্বৈত গান “দ্বিধা” (থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার ছবি) শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে এবং এটি তার প্রথম মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের ভিত্তি তৈরি করে। হাবিবের সঙ্গে তাঁর দ্বৈত গানগুলো (যেমন “এতো দিন কোথায় ছিলে”খোঁজ-দ্য সার্চ, ২০১০) বাংলাদেশী সংগীতের এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

২০১১ সালে ‘প্রজাপতি’ ছবির “স্পর্শ”“দু দিকে বসবাস” গানের জন্য তিনি প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী) লাভ করেন। এই গানগুলোর আবেগপূর্ণ রেন্ডিশন তাঁকে প্লেব্যাক কুইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একই বছর ‘কে আপন কে পর’ ছবিতে কণ্ঠ দেন।

২০১২ সালে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘রঙ’ মুক্তি পায়, যাতে রঙিন রোমান্সের ছোঁয়া রয়েছে। ‘ভালোবাসার রঙ’ ছবির “গভীরে আরো গভীরে”“ভালোবাসার একটু বেশি” জনপ্রিয় হয়।

২০১৩ সালে তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘মায়াবি আকাশ নীল’ এবং আসিফ আকবরের সঙ্গে দ্বৈত অ্যালবাম ‘ঝগড়ার গান’ বের হয়। ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ছবির “আকাশ হতে আমি চাই” গানটি ইউটিউবে লক্ষ লক্ষ ভিউ পায়।

২০১৬ সালে ‘সুইটহার্ট’‘নিয়তি’ ছবিতে কণ্ঠ দেন। চতুর্থ একক অ্যালবাম ‘ভালোবাসো বলে’ (সাউন্ডটেক) মুক্তি পায়, যার গীত রচনা আহমেদ রিজভী এবং সুর-সঙ্গীত শফিক তুহিনের। এছাড়া ‘ওয়ার্নিং’ (২০১৫) এবং ‘চোরাবালি’ (২০১২) ছবিতে অবদান রয়েছে।

পরবর্তীকালে তিনি ‘এই তো প্রেম’ (শাকিব খানের ছবি), ‘বসগির’ প্রভৃতি ছবিতে গান করেন। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গান: “বোলেতো দিয়েছি হৃদয়ের কথা”, “মন হারালো” (নিয়তি), “এমন একটা মন” (২০২০ সিঙ্গেল), “তুমি আসবে বলে” এবং “ভালোবাসার গান” অ্যালবামের গানগুলো। ২০২৪ সালে ফিরে এসে ভালোবাসা দিবসে “সাতটি মাস” (এহসান রাহীর সঙ্গে দ্বৈত) মুক্তি পান, যা রোমান্টিক থিমের এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হিট। সাম্প্রতিককালে মেয়ে রোদেলার সঙ্গে প্রথম যৌথ গান “কেন” (প্রত্যয় খানের সঙ্গে, ২০২৫) প্রকাশিত হয়েছে, যা মা-মেয়ের বন্ধনের সুন্দর প্রতিফলন। ন্যান্সির গানগুলোতে আধুনিক পপ, লোক এবং ক্লাসিক্যালের মিশ্রণ রয়েছে, যা তাঁকে বহুমুখী শিল্পী করে তোলে। তাঁর অ্যালবামগুলো যেমন “তুমি আসবে বলে” এবং “ভালোবাসার গান” বাংলাদেশী পপ সংগীতের মাইলফলক।

নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি

পারিবারিক জীবন

ন্যান্সির ব্যক্তিগত জীবন চ্যালেঞ্জপূর্ণ। ২০০৬ সালে ব্যবসায়ী আবু সাঈদ সৌরভকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র মেয়ে রোদেলা, যে এখন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে উঠে আসছে। ২০১২ সালের ২৪ মে এই সংসারের ইতি ঘটে।

২০১৩ সালের ৪ মার্চ নাজিমুজ্জামান জায়েদকে বিয়ে করেন। জায়েদ ময়মনসিংহ পৌরসভায় চাকরির পাশাপাশি ব্যবসায়ী। ২০২১ সালে ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন।

২০২১ সালের আগস্টে গীতিকার ও অডিও প্রযোজক মহসিন মেহেদীর সঙ্গে তৃতীয়বারের মতো বাগদান ও বিয়ে করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয় সন্তান মেহেনাজ (কন্যা)-এর গর্ভধারণের ঘোষণা দেন এবং জুন মাসে মা হন। ন্যান্সি সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই পরিবার নিয়ে শেয়ার করেন, বিশেষ করে মেয়ে রোদেলাকে “আধুনিক করে গড়ে তোলা”র কথা বলেন। তাঁর বাড়ি ঢাকায় এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রতি আগ্রহ রয়েছে।

রাজনৈতিক জীবন ও চ্যালেঞ্জ

২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ন্যান্সি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অঙ্গসংগঠন জাসাস (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা)-এর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সহ-সভাপতি হন। একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে নিষিদ্ধ করে, যার ফলে ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় এক দশক সংগীতজগতে অনুপস্থিত ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “তাবেদারি করা ছাড়া তাদের কিছু করারও ছিল না” এবং আওয়ামীপন্থী শিল্পীদের প্রসঙ্গে অভিযোগ করেন যে, রাজনৈতিক কারণে তাঁর কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪-এর পরিবর্তনের পর তিনি আবার সক্রিয় হয়ে নতুন গান মুক্তি করছেন। এছাড়া, ২০২৩ সালে তাঁর বাসা থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অলংকার চুরির ঘটনা ঘটে, যার তদন্ত চলছে। ন্যান্সি লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে ফিরেছেন এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রতি আগ্রহী।

পুরস্কার ও সম্মাননা

ন্যান্সির অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে:

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১১): শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী (প্রজাপতি)
  • মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার: টানা ছয়বার (২০১০-২০১৫/১৬) শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী (তারকা জরিপ); কিছু উৎসে ১৩ বার
  • যুগান্তর পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড
  • কালচারাল জার্নালিস্ট ফেডারেশন অব বাংলাদেশ (সিজেএফবি) পুরস্কার
  • মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
  • বায়োস্কোপ বর্ষসেরা পুরস্কার

 

নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি

 

উত্তরাধিকার ও সাম্প্রতিক কার্যক্রম

ন্যান্সির গান আজও বাংলাদেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে আছে। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি নতুন প্রজেক্ট নিয়ে সক্রিয়, যেমন ২০২৪-এর “সাতটি মাস” এবং মেয়ের সঙ্গে যৌথ গান।

Leave a Comment