নির্বাচনী গান এখন কোটি টাকার বাজার

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রচারমূলক গান ব্যবহারের ঐতিহ্য নতুন নয়। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই গানগুলির উৎপাদন ও বিতরণ শহর-গ্রাম উভয়েই একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে, যা কয়েক কোটি টাকার বাজার মূল্য অর্জন করেছে—পূর্ববর্তী যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় এটি একেবারে অনন্য।

ঢাকার সরু গলি থেকে গ্রামীণ হাট-পাড়া এবং ধানক্ষেত পর্যন্ত নির্বাচন-থিমযুক্ত গানের সুর সম্প্রচারিত হচ্ছে। বেশিরভাগ গানই জনপ্রিয় বাংলা হিটের অঙ্গসংস্করণ, যেমন ‘দুষ্টু কোকিল’, ‘বুক চিঞ্চ চিঞ্চ করে’, ‘নয়া দমন’, ‘রূপবান-এ নাচে কোমর দুলাইয়া’, এবং ‘আম্মাজান’। মূল সুর অপরিবর্তিত রেখে, গানের কথায় প্রার্থী, দলীয় প্রতীক ও প্রচার স্লোগান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ঢাকায় মগবাজার, বিজয়নগর ও উত্তরা সহ বিভিন্ন এলাকায় এক শতাধিক স্টুডিও বর্তমানে প্রচারমূলক গান রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত। উত্তরার রইহান রেকর্ডিং স্টুডিওর মালিক রইহান মিয়া জানালেন, “প্রার্থী চাইলে আমরা জনপ্রিয় সুর ব্যবহার করে তার জন্য বিশেষ গান তৈরি করতে পারি।”

চাঁদপুরের রাজ এড মিডিয়া তিন শিফটে কাজ করছে। স্টুডিও প্রধান রাব্বি রাজ বলেন, “প্রতিটি প্রার্থীর জন্য আমরা সাধারণত ১০–১২টি গান তৈরি করি। মূলত সবকিছু একই থাকে, শুধুমাত্র প্রার্থীর নাম, দলীয় প্রতীক ও আসন পরিবর্তিত হয়।”

প্রচারণা গান উৎপাদনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ (ঢাকা ও চাঁদপুর)

স্টুডিওআনুমানিক উৎপাদিত গানগানের গড় দৈর্ঘ্যজনপ্রিয় মূল সুরAI ব্যবহারের পরিমাণ
রইহান রেকর্ডিং, উত্তরা২০০+৫ মিনিটদুষ্টু কোকিল, বুক চিঞ্চ চিঞ্চ করে ইত্যাদি৩০ গান
রাজ এড মিডিয়া, চাঁদপুর৩০০+৫ মিনিটপ্রধানত জনপ্রিয় বাংলা হিটআংশিক AI ব্যবহৃত

উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আংশিকভাবে আধা-প্রশিক্ষিত সঙ্গীতশিল্পীরা যুক্ত থাকলেও, এবার প্রথমবার নির্বাচনী প্রচারণার গান তৈরিতে AI ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে দেখা গেছে। প্রতিটি গান রেকর্ড করতে প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগে এবং স্টুডিও থেকে প্রার্থী পর্যন্ত একটি কপি পৌঁছানোর খরচ ২,০০০–৩,০০০ টাকা। এই মৌসুমে রইহান রেকর্ডিং ও রাজ এড মিডিয়া মিলিয়ে প্রায় ২,৭০০টি গান তৈরি হয়েছে, যা কয়েক কোটি টাকার বাজার মূল্য গড়ে তুলেছে।

আইনি দিকেও সতর্কতা জরুরি। বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০২৩ অনুসারে অনুমতি ছাড়া সুর পুনরায় ব্যবহার করা অপরাধ। বাংলাদেশ লিরিসিস্ট, কম্পোজার ও পারফর্মার্স সোসাইটি (BLCPS) এবং প্রাক্তন রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী জানিয়েছেন, লঙ্ঘনকারীরা সর্বোচ্চ চার বছরের কারাদণ্ড বা ৫,০০,০০০ টাকা জরিমানা ভোগ করতে পারেন। তবে বাস্তবায়ন এখনও অসম্পূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটারকে প্রভাবিত করতে গান ব্যবহার নতুন কিছু নয়, তবে প্রযুক্তি ও AI সংযোজন গত ৫–৭ বছরে তাদের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে নির্বাচনী গান একটি বৈচিত্র্যময় এবং লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা কোটি টাকার বাজার দখল করেছে।