ভারতীয় সঙ্গীত জগতে পণ্ডিত অহোবল এমন এক নাম, যার অবদান ভারতীয় সঙ্গীততত্ত্বকে এক বৈজ্ঞানিক, সুসংগঠিত এবং শাস্ত্রীয় রূপ প্রদান করেছে। তাঁর অমর গ্রন্থ ‘সঙ্গীত পারিজাত’ (Saṅgīta Pārijāta) উচ্চাঙ্গ সংগীতের অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ ও অনুশীলনে এখনো পথপ্রদর্শনের ভূমিকা পালন করে। তিনি ছিলেন গভীর পাণ্ডিত্য, অদ্বিতীয় পর্যবেক্ষণশক্তি, সৃষ্টিশীল সংগীত বোধ এবং বৈজ্ঞানিক মননসম্পন্ন এক মহাপুরুষ।
Table of Contents
সঙ্গীত পারিজাত’-এর স্রষ্টা ও ভারতীয় সঙ্গীততত্ত্বের অমর পুরোধা
জন্মকাল ও জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ
পণ্ডিত অহোবলের জন্মসাল ও স্থান সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে একমত সিদ্ধান্ত নেই। কারণ তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রাপ্য তথ্য অল্প ও বিচ্ছিন্ন। তবে বিভিন্ন পণ্ডিত–রচনার ভিত্তিতে ধারনা করা হয়—
কেউ বলেন তিনি ১৫শ শতকে জন্ম নেন
কেউ বলেন ১৬শ শতকে
আবার অনেকে তাঁকে ১৭শ শতকের শাস্ত্রকার বলে উল্লেখ করেন
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে অধিকাংশ গবেষকই মত দেন যে—
১৬শ শতকের শেষভাগ অথবা ১৭শ শতকের প্রথমার্ধই অহোবলের প্রকৃত জন্মকাল হতে পারে।

পরিবার ও শৈশব
অহোবল দাক্ষিণাত্যের দ্রাবিড় (দ্রাবিড়ীয়) বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শ্রীকৃষ্ণ পণ্ডিত ছিলেন সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্রের এক খ্যাতিমান পণ্ডিত। এর প্রভাবে অহোবল শৈশবেই—
- সংস্কৃত ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন
- স্মৃতিশক্তি ও ব্যাকরণে পারদর্শী হয়ে ওঠেন
- প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রের মূল গ্রন্থগুলো পড়ার উপযুক্ত যোগ্যতা লাভ করেন
সঙ্গীতে শিক্ষা ও বিস্তৃত ভ্রমণ
অহোবলের সঙ্গীতচর্চার সূচনাও দক্ষিণ ভারতেই। তিনি—
- দক্ষিণী সঙ্গীতশাস্ত্রের প্রধান গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করেন
- বীণা ও কণ্ঠসংগীতে দীর্ঘকাল সাধনা করেন
- রাগ, স্বর, তাল, লয়, গায়কি ও বাদনশৈলীতে বিশেষ নৈপুণ্য অর্জন করেন
পরবর্তীতে তিনি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতশিক্ষার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হন। তিনি বহু সঙ্গীতগুরু–পণ্ডিতদের সংস্পর্শে আসেন, যাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য—
- পণ্ডিত লোচন
- অন্যান্য উত্তর ভারতীয় তত্ত্ববিদ ও সংগীতজ্ঞগণ
এই ভ্রমণই তাঁর সঙ্গীতচিন্তা ও গবেষণার পরিধিকে আরও প্রসারিত করে। দক্ষিণ–উত্তরের সংগীতধারা মিলিয়ে তিনি তৈরি করেন বিশুদ্ধ, স্বতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক সঙ্গীত–দর্শন।
রাজসভায় সম্মান ও পণ্ডিত অহোবলের প্রতিষ্ঠা
অহোবলের জ্ঞান, পরিশ্রম ও শিল্পীসুলভ বোধ তাঁর প্রতিভাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায় যে—
ধর্মগড় নগরের রাজা তাঁকে সভাগায়কের পদে নিয়োগ করেন।
রাজা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং তাঁর গবেষণা ও সৃষ্টিকে নানা উপায়ে উৎসাহ দিতেন। রাজকীয় সহায়তাই তাঁকে ‘সঙ্গীত পারিজাত’ রচনায় পূর্ণ সময় ও অনুকূল পরিবেশ প্রদান করে।

অহোবলের অমর কীর্তি — সঙ্গীত পারিজাত
রচনাকাল : আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ
‘সঙ্গীত পারিজাত’ ভারতীয় সঙ্গীত–তত্ত্বের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এটি—
- প্রাচীন শাস্ত্রীয় সংগীত তত্ত্ব
- রাগ, রাগিণী, তাল ও লয়ের বিশ্লেষণ
- যন্ত্রসংগীতের বৈজ্ঞানিক গঠন
- সুরের প্রকৃতি ও মানসিক প্রভাব
- মানবসমাজ ও প্রাণীজগতের মধ্যে সুর ও শব্দের সম্পর্ক
—এসব বিষয়কে একত্রে সমন্বিত করে।
গ্রন্থটির বৈজ্ঞানিক অবদান
অহোবলের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলির মধ্যে একটি হলো—
বীণার তারের দৈর্ঘ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিভক্ত করে ১২টি স্বর (৭ শুদ্ধ + ৫ বিকৃত) নির্ধারণ।
এই কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—
দুই শতাব্দী পরে পাশ্চাত্যের গণিতবিদগণ একই রকম সুরবিভাগ তত্ত্ব আবিষ্কার করেন।
অর্থাৎ অহোবল ভারতীয় সংগীতে স্বর–স্থাপনার এমন এক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করেন, যা সময়ের তুলনায় যুগান্তকারী ছিল।
সঙ্গীত তত্ত্বে নতুন মাত্রা এনে দেয়ার প্রমাণ
‘সঙ্গীত পারিজাত’–এ অহোবল আরও—
- মানুষের মানসিক অবস্থা অনুযায়ী রাগের প্রভাব
- প্রকৃতি, ঋতু ও পরিবেশের সঙ্গে সুরের সম্পর্ক
- প্রাণীজগতে সুরের প্রভাব
- নৃত্য, বাদ্য ও গায়নের সামঞ্জস্য
- শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নৈতিকতা ও রসতত্ত্ব
—এসব বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
এ থেকে বোঝা যায় তিনি কেবল একজন শাস্ত্রকারই নন; ছিলেন একজন পর্যবেক্ষক, বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক ও দার্শনিক।
অহোবলের গুরুত্ব ও আজকের সময়ে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা
আজও ভারতীয় সঙ্গীতশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘সঙ্গীত পারিজাত’—
- গবেষণার মূল পাঠ্য
- রাগ–রাগিণী নির্ধারণের উৎস
- ভারতীয় সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ রেফারেন্স গ্রন্থ
- তত্ত্বশিক্ষার্থীদের মৌলিক ভিত্তি রূপে সমানভাবে সম্মানিত।
উত্তর ভারতের প্রায় সব ঘরানার গুরু–শিষ্য পরম্পরায় এই গ্রন্থের প্রভাব সুস্পষ্ট।
