পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর [Pandit Omkarnath Thakur ] এর জীবনী নিয়ে আজকের আলোচনা। ভারতের গুজরাট রাজ্যের বরোদার জহাজ নামক গ্রামে ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুন এক অভিজাত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর। তাঁর পিতা পণ্ডিত গৌরীশংকর ঠাকুর প্রণব মন্ত্রের (ওঁ) উপাসক ছিলেন বলে সন্তানের নাম ওঙ্কারনাথ রাখবেন স্থির করেছিলেন। শিশুপুত্রের চার বছর বয়স হলে ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে কোনো একটি কারণে গ্রাম ত্যাগ করে তারা নর্মদাতীরে কুটির বানিয়ে বসবাস শুরু করেন।

পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর
মাত্র চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর বাবা-মা ও ভাইয়ের ভরণপোষণের জন্য বালক ওঙ্কারনাথকে উপার্জন শুরু করতে হয়। তার পিতৃভক্তি, কর্তব্যনিষ্ঠা ও সুন্দর মায়াবী চেহারার কারণে এক কারখানার মালিক তাঁকে দত্তক নিতে আগ্রহী হন। বিনিময়ে পণ্ডিত গৌরীশংকরকে প্রচুর ধনরত্ন দানের প্রস্তাব দেন। কিন্তু দূরদর্শী পিতা তাতে অসম্মতি জানিয়ে বলেন যে, এই বালক সরস্বতী মায়ের বরপুত্র। ভবিষ্যতে সে অনেক সম্মান লাভ করবে।

বাল্যকাল থেকেই ওঙ্কারনাথের কন্ঠস্বর অত্যন্ত সুমধুর ও ঐশ্বর্যশালী ছিল। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর মধুরকণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি শুনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ মুগ্ধ হতেন সাত্ত্বিক জীবনযাপনকারী ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর, সে সময় জ্যৈষ্ঠ মাসের এক শুক্লা পূর্ণিমার দিন সকাল ৯টায় যোগসমাধিতে মগ্ন হয়ে প্রণবমন্ত্র গাইতে গাইতে পিতা শ্রী গৌরীশংকর ঠাকুর দেহত্যাগ করেন।
এরপর একটি চমৎকার ঘটনায় তাঁর জীবনধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ভরোচ শহরে তখন বসবাস করতেন ‘শেঠ শাহপুর জি মংচের জি ডুংগা’ নামে এক উদার দানশীল পার্সি গৃহস্থ। তিনি কিশোর শিল্পী ওঙ্কারনাথের গান শোনার জন্য তাঁকে নিমন্ত্রণ করেন। গান শুনে তিনি এতটাই মোহিত হন যে, আরো সংগীতশিক্ষা গ্রহণের জন্য মুম্বাই নগরে অবস্থিত প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর পলুস্করের বিখ্যাত ‘গান্ধর্ব বিদ্যালয়ে’ তাঁকে ভর্তি করে দেন। পনেরো বছর বয়সের কিশোর ওঙ্কারনাথ সেখানে ভর্তি হয়ে কঠোর সাধনা ও অধ্যবসায়ের গুণে পাঁচ বছরের পাঠ মাত্র তিন বছরেই সম্পন্ন করে ফেলেন।

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে কাঠিয়াওয়াড় থেকে একটি নাট্য কোম্পানি মুম্বাই শহরে আসে। তাদের প্রয়োজন ছিল অল্প বয়সী একজন গুণী সুদর্শন গায়ক। ওঙ্কারনাথের বড় ভাই সেই নাট্যদলে চাকরির জন্য তাঁকে নিয়ে গেলে মাসিক ৪০০ টাকা বেতনে ওঙ্কারনাথকে নিযুক্ত করা হয়। অথচ সে সময় সংগীতশিক্ষা ত্যাগ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না। কেননা তাঁর সুরপিয়াসী মন আরো বেশি সংগীতশিক্ষা লাভে উদগ্রীব ছিল এতে বড় ভাই অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তাঁকে ‘গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়’ থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু ওঙ্কারনাথের প্রার্থনা অনুযায়ী অধ্যক্ষ মহোদয়ের আন্তরিক সহযোগিতায় বড় ভাইয়ের এই সর্বনাশী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
সংগীতশিক্ষা সম্পন্ন হলে ওঙ্কারনাথ ঠাকুর লাহোর গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে’র অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং অল্প সময়েই খ্যাতি অর্জন। করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন সংস্থা আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে জনসাধারণের হৃদয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় পাঞ্জাবের অভিজাত পর্দানশিন মহিলাদের মধ্যেও সংগীতচর্চার প্রসার সম্ভব হয়েছিল।

পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের গায়কি বেশ উচ্চস্তরের এবং একই সঙ্গে স্বর ও ভাবপ্রধান ছিল। তাঁর কণ্ঠস্বর এতটাই সুমধুর ও সতেজ ছিল যে, গান পরিবেশনের সময় দুই পাশে বাজানো সম্মিলিত তানপুরার আওয়াজও তুলনামূলক ক্ষীণ মনে হতো। তাঁর গান শুনে মনে হতো সংগীতশাস্ত্রজ্ঞানের সাগর হতে উঠে আসা উচ্ছল সুরতরঙ্গ খেলা করছে গভীর ভালোবাসায়। মাঝেমধ্যে তিনি নিজস্ব গায়নরীতির সঙ্গে পাশ্চাত্য স্বরসংগতির সুন্দর সম্মিলন ঘটিয়ে শ্রোতা-দর্শকদের চমৎকৃত করে দিতেন।

সংগীতভুবনের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ওস্তাদ হসু খার সুযোগ্য পুত্র ওস্তাদ রহমত খাঁ প্রায়ই পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর পলুস্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। এই সুযোগে ওঙ্কারনাথ তাঁর কাছেও তালিম নিতে ভুল করতেন না। ফলে তিনি ওস্তাদ হসু ও ওস্তাদ হদ্দু খাঁর আলাপরীতি খুব সহজেই রপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ প্রধানত খেয়াল গায়ক হলেও ধ্রুপদ, ধামার ও টপ্পা গাইতে পারতেন অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে। দেড় ঘণ্টা ধরে একটি রাগকে বিভিন্ন ঢঙে পরিবেশন করে তার প্রকৃত রূপ অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে প্রস্ফুটিত করে তুলতেন। ক্লিষ্ট, বক্র এবং কূটতানেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। এর সঙ্গে তাঁর নিজস্ব রীতির ঝুকা ও আলাপ যুক্ত করে সৃষ্টি করতেন মোহনীয় সুরের মূর্ছনা।
স্বরসিদ্ধি ও সংগীত ব্যাখ্যা উভয় বিষয়েই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। গুজরাটি, মারাঠি ও হিন্দুস্তানি ভাষায় তিনি সংগীতশাস্ত্র ব্যাখ্যা করতে পারতেন। পাঞ্জাবি এবং ইংরেজি ভাষাও তিনি জানতেন। সিন্ধু প্রদেশে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে এক বিশাল সংগীত সম্মেলনে ২৮ দিন ধরে সংগীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ৬৪টি আলোচনা হয়। পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর এতে অংশগ্রহণ করে গানের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে শোনান।
এরপর ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স নগরে আন্তর্জাতিক সংগীত সম্মেলনে যোগদান করেন। এ সময় রাশিয়া যাওয়ার নিমন্ত্রণ পেলেও তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি ইন্দরা দেবীর মৃত্যু হলে দেরি না করে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর ‘বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে’ সংগীত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক পদ অলংকৃত করেন।
একবার মহাত্মা গান্ধী তাঁর সুমধুর কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি শুনে বলেছিলেন ‘আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নানা ভাষণের মধ্য দিয়ে সাধারণের মনে যে দেশপ্রেমের উদ্রেক করতে সমর্থ হয়েছি, তার চেয়ে ওংকারনাথজীর গানটি (বন্দে মাতরম) অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম।’
পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন যুগান্তকারী শিল্পী। তাঁর গাওয়া রাগের স্বরবিস্তার, তান ও লয়কারী ছিল অপূর্ব সাধনালব্ধ অর্জন। ভজন ও অন্যান্য শৈলীর সংগীতে তিনি খুবই পারদর্শী ছিলেন। কয়েকটি রাগের স্রষ্টা পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর ক্রিয়াত্মক সংগীতে পারদর্শিতার সঙ্গে সঙ্গে ঔপপত্ত্বিক বিষয়েও অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি হিন্দি ভাষায় প্রণব ভারতী ও সংগীতাঞ্জলি (৫টি খণ্ড) এবং গুজরাটি ভাষায় রাগ অনে রস নামে সংগীতবিষয়ক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন।
উপমহাদেশের বিখ্যাত পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য তাঁর সংগীতে মুগ্ধ হয়ে ‘সংগীত প্রভাকর’ উপাধি প্রদান করে তাঁকে সম্মানিত করেন। ইতালির রাষ্ট্রনায়ক বেনিতো মুসোলিনি পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে বীর, করুণ ও শান্ত রসের গান শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি রোমের রয়াল অ্যাকাডেমি অব মিউজিকে’র অধ্যক্ষ মহোদয়কে নির্দেশ দেন পণ্ডিতজির গানের স্বরলিপি লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য। ভারত সরকার ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে এই মহান শিল্পীকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
সুরের ভুবনে অসামান্য অবদান রেখে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর ৭০ বছর বয়সে সুরপ্রাণ সংগীতশিল্পী ও শাস্ত্রকার পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর অনন্ত পথের যাত্রী হন।

