১৯৯২ সালে প্রকাশিত Tomake Chai অ্যালবামের একটি শক্তিশালী ও স্মরণীয় গান “পাগল”, যেখানে Kabir Suman শহুরে সভ্যতার প্রান্তে ছিটকে পড়া মানুষের এক গভীর প্রতীকী ছবি এঁকেছেন। গানটির “পাগল” আসলে কোনো একক চরিত্র নয়; সে সমাজের সেইসব মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের কোনো পরিচয় নেই, ভোটের রাজনীতিতে যাদের প্রয়োজন হয় না, অর্থনীতি বা উন্নয়নের হিসাবেও যাদের অস্তিত্ব অদৃশ্য।
গানের বর্ণনায় আমরা দেখি—অযত্নে থাকা শরীর, জটপড়া চুল, ফুটপাতে দিনযাপন, এবং সম্পূর্ণ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। কিন্তু এই বাহ্যিক অবহেলার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর দার্শনিক ব্যঞ্জনা: “সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে।” অর্থাৎ জীবনের অনিশ্চয়তা, ভাগ্যের নির্মমতা এবং সমাজের কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতীকী প্রতিবাদ।
গানটির দ্বিতীয় স্তবকে গণতন্ত্রের ভণ্ডামি তুলে ধরা হয়েছে—যে মানুষটির “ভোট চাইবে না কোনো প্রার্থী”, সে যেন রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখে অদৃশ্য নাগরিক। এখানে কবীর সুমন কেবল দারিদ্র্য নয়, নাগরিক অধিকারহীনতার কথাও তুলে ধরেছেন।
শেষ স্তবকে ধর্ম, রাজনীতি, ভোগবাদ, শিল্প, শ্রমিকের বঞ্চনা—সবকিছুকে একসঙ্গে এনে তিনি দেখান, সভ্যতার জাঁকজমকপূর্ণ কাঠামোর ভেতরে অসংখ্য মানুষ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে আছে। তাই “পাগল” গানটি শুধু একজন ভবঘুরের গল্প নয়; এটি আধুনিক নগর সভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতার এক তীক্ষ্ণ সামাজিক দলিল।
পাগল ….
এক মুখ দাঁড়ি গোঁফ
অনেক কালের কালো ছোপ ছোপ
জট পড়া চুলে তার
উকুনের পরিপাটি সংসার
পিচুটি চোখের কোণে
দৃষ্টি বিস্মরণে মগ্ন
বাবু হয়ে ফুটপাতে
একা একা দিনরাতে রঙ্গে
পাগল পাগল
সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে।
চালচুলো নেই তার
নেই তার চেনা বা অচেনা
আদমসুমারী হলে
তার মাথা কেউ গুনবেনা
তার ভোট চাইবেনা
গণতান্ত্রিক কোন প্রার্থী
সরকারে দরকার নেই
তাই নিজের সুড়ঙ্গে
পাগল পাগল
সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে।
বটতলা চুম্বন পদ্ধতি
পেটমোটা ব্যকরণ বই
ধর্ম বা রাজনীতি
ঠাকুরের ছবি থেকে হরিবোল খই
সারিবাদীসালসা
ভোগীর লালসা
আর অভোগীতে গান
হঠাৎ হাসপাতালে
অকারণে ফাকতালে মহাপ্রয়াণ
ভিডিও ক্যাসেটে আর নীল সোফাসেটে
বসে মিঠে খুনসুটি
লকআউট কারখানায় তামাদি মজুরি
আর কেড়ে নেয়া রুটি
জগতে যা কিছু আছে
কিছু নেই তার অনুসঙ্গে
পাগল পাগল
সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে।
