পান্নালাল ভট্টাচার্য বাংলা ভক্তিগীতির জগতে বিশেষ করে শ্যামাসঙ্গীত কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। তার গাওয়া বেশিরভাগ শ্যামাসঙ্গীতের গীতিকার হলেন বাংলার শাক্ত কবি রামপ্রসাদ সেন, নয় তো কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। তিনি বাংলাগানের স্বর্ণযুগের স্বনামধন্য শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের অনুজ।
Table of Contents
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
পান্নালাল ভট্টাচার্য বৃটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার বালির বারেন্দ্র পাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩৩৬ বঙ্গাব্দে) এক শাক্ত পরিবারে। তার পিতা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তার জন্মের আগেই মারা যান। মাতা অন্নপূর্ণা দেবী সুন্দর গান গাইতেন। এগারোজন জন ভাই বোনদের মধ্যে পান্নালাল ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তার অভিন্নহৃদয়ের বন্ধু ছিলেন হাওড়ার বালিরই জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সনৎ সিংহ।
সঙ্গীতজীবন
পান্নালালের ইচ্ছা ছিল চলচ্চিত্রের নেপথ্য গায়ক হবেন, আধুনিক গান গাইবেন। সেসময় বাংলা আধুনিক গানে স্বর্ণযুগের খ্যতিমানরা হলেন শচীন দেববর্মণ, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র প্রমুখেরা।
পান্নালালের মধ্যে ভক্তিরসের সন্ধান পেয়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সতের বৎসর বয়সে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রফুল্ল ভট্টাচার্য তাকে আর বন্ধু সনৎ সিংহ কে নিয়ে যান এইচ এম ভি’তে। ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না ফুরিল, সকলই ফুরায়ে যায় মা’ শ্যামাসঙ্গীত দিয়ে তার প্রথম গান গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ড হয়।
পান্নালাল ভট্টাচার্য ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কথামতো আধুনিক আর ছবিতে নেপথ্য সঙ্গীত ছেড়ে ভক্তিমূলক গানকে নিজের কণ্ঠে ঠাঁই দিলেন এবং প্রকৃত অর্থে সাধক -গায়ক হয়ে উঠলেন। পান্নালাল জীবদ্দশায় ৩৬ টি আধুনিক গান সমেত ১৮ টি রেকর্ড, ৩ টি বাংলা ছায়াছবির গান এবং চল্লিশটি শ্যামাসঙ্গীতের রেকর্ড করেছেন।”শ্রী অভয়” নাম দিয়ে তার লেখা ও সুর দেওয়া বেশ কিছু শ্যামাসঙ্গীত আছে।
ব্যক্তিগত জীবন
পান্নালাল ভট্টাচার্য বিবাহ করেছিলেন এবং স্ত্রী কন্যাদের সাথে পারিবারিক অবস্থা ও সম্পর্ক ভালই ছিল। কিন্তু তার অকাল প্রয়াণে তার পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য গ্রহণ করেন।
জনপ্রিয়তার শিখরে
বাঙালি হিন্দুদের কাছে কালীপূজা বা শ্যামাপূজা ও পান্নালাল ভট্টাচার্যের গান সমার্থক। তার গানের মধ্য দিয়েই যেন নিবেদিত হয় হৃদয়ের সমস্ত আকুতি বিকুতি। তাই তার ভক্তিমূলক গানের চাহিদা অনেক – সবার উপরে।
শেষ দিনগুলি ও জীবনাবসান
পান্নালাল কোন দিন নিজেকে নিয়ে, নিজের গান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন নি। তার ভ্রাতা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য মা ভবতারিণী দর্শন পেতেন, কিন্তু তার কোনদিন সেরকম মাতৃদর্শন হয়নি। সেকারণে শিশুর মত কাঁদতে কাঁদতে মা কে ডাকতেন। দেবীদর্শন না করতে পাওয়ার অবসাদে, অতৃপ্তি নিয়ে তিনি আত্মহনন করেন ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ শে মার্চ ( ১৩৭২ বঙ্গাব্দের ১৩ ই চৈত্র) কলকাতার কাকুলিয়া রোডের বাড়িতে মাত্র ৩৬ বৎসর বয়সে।
