পারভেজ রব: ঢাকাই সিনেমার এক নিভৃতচারী সুরের জাদুকর

ঢাকাই চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দার দিকে তাকালে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে, যাঁরা ক্যামেরার চটকদার আলো থেকে নিজেদের সবসময় কিছুটা দূরে রাখতেন, কিন্তু পর্দার পেছনের সৃষ্টি দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে নিতেন। এমনই এক ক্ষণজন্মা, গুণী এবং প্রচারবিমুখ সুরস্রষ্টা ছিলেন পারভেজ রব। স্রেফ সস্তা মেলোডি নয়, বরং মাটির খাঁটি টান আর আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দারুণ এক ফিউশন ছিল তাঁর কাজের মূল সিগনেচার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৭৫টিরও বেশি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করে তিনি এদেশের প্লেব্যাক মিউজিকের ভুবনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

পারভেজ রব: ঢাকাই সিনেমার এক নিভৃতচারী সুরের জাদুকর

পারভেজ রব
পারভেজ রব

অভিজাত বংশমর্যাদা ও সুরের পারিবারিক আবহ

পারভেজ রবের জন্ম ও বেড়ে ওঠার পেছনে ছিল এক সম্ভ্রান্ত পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য। তাঁর পিতা আব্দুর রব ছিলেন পাকিস্তান আমলের একজন নামী ‘এমএনএ’ (মেম্বার অফ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি)। তবে পারিবারিক এই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির মাঝেও পারভেজ রবের মন টেনেছিল সুরের ভুবন।

শুধু রাজনীতি নয়, তাঁর পরিবারে জড়িয়ে ছিল এদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অমোঘ সুর। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শব্দসৈনিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিংবদন্তি কণ্ঠযোদ্ধা ও সুরকার আপেল মাহমুদ ছিলেন পারভেজ রবের আপন চাচাতো ভাই। ভাইয়ের সেই সুরের আগুন আর ঘরের ভেতরের সাংস্কৃতিক পরিবেশটাই কিশোর বয়সে পারভেজ রবের মগজে সঙ্গীতের গভীর বীজ বুনে দিয়েছিল।

চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ভুবন ও অবদান

পারভেজ রব মূলত নব্বইয়ের দশক এবং তার পরবর্তী সময়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে একজন ব্যস্ত সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সে সময় চলচ্চিত্রের চেনা ফর্মুলার বাইরে গিয়েও মেলোডিয়াস ও ধ্রুপদী ধারার গান তৈরিতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

তিনি তাঁর ক্যারিয়ারে প্রায় ৭৫টি চলচ্চিত্রে প্রধান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সুর ও সঙ্গীতায়োজনে তৈরি হওয়া গানগুলো যেমন ছিল আবেগে ঠাসা, তেমনই চলচ্চিত্রের গল্পের সাথে মিশে যেত দারুণভাবে। প্লেব্যাক মিউজিকের পাশাপাশি অডিও ইন্ডাস্ট্রিতেও তাঁর চমৎকার কিছু কাজ রয়েছে।

নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা

পারভেজ রব শুধু স্টুডিওর চার দেওয়ালে নিজেকে আটকে রাখেননি। এদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এবং শিল্পীদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তিনি সবসময় প্রথম সারিতে ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বহু তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীকে যেমন সুযোগ করে দিয়েছেন, তেমনই দেশের সাংস্কৃতিক মানোন্নয়নে আজীবন কাজ করে গেছেন।

এক নির্মম ট্র্যাজেডি এবং চিরবিদায়

২০আইএমডিবি বা উইকিপিডিয়ার পাতায় তাঁর নামটা হয়তো খুব বড় করে লেখা নেই, কিন্তু ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দিনটি ঢাকাই মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক কালো অধ্যায় হয়ে আসে। ঢাকার উত্তরায় এক মর্মান্তিক ও নির্মম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন এই গুণী সুরকার। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে, যখন তাঁর আরও অনেক সুর সৃষ্টির ক্ষমতা ছিল, তখনই এক নিমেষে নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ।

যে মানুষটি সারা জীবন সুরের ছন্দ দিয়ে মানুষের মন ভরিয়েছেন, তিনি নিজেই ঢাকা শহরের নির্মম পিচঢালা রাজপথে এক বেসুরো ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে বিদায় নিলেন।

পারভেজ রব
পারভেজ রব

পারভেজ রব হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ৭৫টি চলচ্চিত্রের সুর ও গানগুলো আজীবন বেঁচে থাকবে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে। মানুষ মরে যায়, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সুর কখনো মরে না—পারভেজ রবের জীবন ও সৃষ্টি আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয়।