পাশ্চাত্য সঙ্গীতে ‘অবলিগাতো’ (Obbligato)

পাশ্চাত্য সঙ্গীত—বিশেষত শাস্ত্রীয় ধারায়—সুর, গঠন ও অভিব্যক্তিকে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সুরকাররা একটি সমৃদ্ধ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। এই পরিভাষাগুলোর মধ্যে ‘অবলিগাতো’ (Obbligato) একটি বিশেষ ও প্রায়ই ভুল-বোঝা ধারণা। বারোক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত বহু সঙ্গীত রচনায় এই শব্দটি ব্যবহৃত হলেও, অনেক শিক্ষার্থী একে সাধারণ সহযোজন (accompaniment), অলংকার বা তাৎক্ষণিক অলংকরণ (improvisation) ভেবে ভুল করেন।

বাস্তবে, অবলিগাতো একটি মৌলিক সঙ্গীতিক ধারণা, যা পাশ্চাত্য সঙ্গীতে গঠন (structure) ও অনুভূতির (expression) ভারসাম্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অবলিগাতো বোঝা মানে—কীভাবে একাধিক সুর পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথন করে, কীভাবে যন্ত্র ও কণ্ঠ আবেগের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়, এবং কীভাবে সঙ্গীত একক রেখার বাইরে গিয়ে বহুস্তরীয় শিল্পে রূপ নেয়—তা বোঝা।

‘Obbligato’ শব্দের অর্থ কী?

Obbligato শব্দটি ইতালীয় ভাষা থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ—
“বাধ্যতামূলক” বা “অবশ্যই পালনযোগ্য”।

সঙ্গীতের ভাষায় এর অর্থ হলো—

এমন একটি যন্ত্র বা সুররেখা, যা রচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অবশ্যই যেমন লেখা আছে তেমনভাবেই পরিবেশন করতে হবে।

অবলিগাতো অংশটি—

  • ঐচ্ছিক নয়
  • শুধুই সহায়ক নয়
  • সাধারণ অলংকারও নয়

এই অংশ বাদ দিলে বা বদলে দিলে পুরো সঙ্গীত রচনাই অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে।

এ কারণে অবলিগাতো আলাদা—

  • Ad libitum (ঐচ্ছিক অংশ)
  • সাধারণ সহযোজন (accompaniment)
  • বা তাৎক্ষণিক অলংকরণ থেকে।

 

 

অবলিগাতো ও সহযোজন (Accompaniment): পার্থক্য

অনেকে মনে করেন, প্রধান সুরের বাইরে যে কোনো যন্ত্রই সহযোজন। কিন্তু বাস্তবে অবলিগাতো ও সহযোজনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।

সহযোজন (Accompaniment)
  • প্রধান সুরকে তাল বা হারমোনিতে সমর্থন করে
  • সহজ করা বা পরিবর্তন করা যায়
  • নিজস্ব স্বাধীন সুর-পরিচয় থাকে না
অবলিগাতো (Obbligato)
  • নিজস্ব স্বতন্ত্র সুরবিন্যাস থাকে
  • মূল সুরের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে জড়িত
  • সুরকারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় লেখা
  • বাদ দিলে রচনার সৌন্দর্য নষ্ট হয়

অনেক ক্ষেত্রে অবলিগাতো যেন মূল সুরের দ্বিতীয় কণ্ঠস্বর—যা কথোপকথনের মতো চলতে থাকে।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতে ‘অবলিগাতো’

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বারোক যুগ (প্রায় ১৬০০–১৭৫০)

অবলিগাতো ধারণাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে গড়ে ওঠে বারোক যুগে, যখন বহুস্বরে রচনা (polyphony), কাউন্টারপয়েন্ট ও যন্ত্রসংগীতে আবেগপ্রকাশ গুরুত্ব পায়।

এই যুগের উল্লেখযোগ্য সুরকার—

  • ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ
  • জর্জ ফ্রিডরিখ হ্যান্ডেল
  • আন্তোনিও ভিভালদি
  • জর্জ ফিলিপ টেলেমান

বারোক কণ্ঠসঙ্গীতে—

  • কণ্ঠ বহন করত মূল কথা ও সুর
  • অবলিগাতো যন্ত্র (বেহালা, বাঁশি, ওবো, অর্গান) প্রকাশ করত অন্তর্গত আবেগ ও আধ্যাত্মিক টান

বাখের ক্যানটাটাগুলিতে প্রায়ই দেখা যায়—একটি ওবো বা বেহালা অবলিগাতো কণ্ঠের অনুভূতিকে প্রতিফলিত করছে বা আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ধ্রুপদী যুগ (১৭৫০–১৮২০)

এই যুগে ভারসাম্য, স্বচ্ছতা ও সৌন্দর্য মুখ্য হয়ে ওঠে।
অবলিগাতো তখন আরও পরিমিত ও মার্জিত রূপ নেয়।

  • মোৎসার্ট তাঁর অপেরায় ক্লারিনেট, বাঁশি বা ওবো অবলিগাতো ব্যবহার করেছেন
  • যন্ত্রটি হয়ে ওঠে কণ্ঠের আবেগী সঙ্গী

 

রোমান্টিক যুগ (১৯শ শতক)

এই সময়ে অবলিগাতো আরও আবেগঘন হয়।

  • শুবের্ট
  • ব্রাহ্মস
  • মালার
  • রিচার্ড স্ট্রস

জার্মান লিড (Lied)-এ পিয়ানো বা যন্ত্র অবলিগাতো এমন অনুভূতি প্রকাশ করে, যা কথায় বলা হয়নি—ব্যথা, স্মৃতি, আকুলতা।

আধুনিক যুগ

আজ হয়তো স্কোরে ‘obbligato’ শব্দটি কম লেখা হয়, কিন্তু ধারণাটি জীবন্ত।

এটি দেখা যায়—

  • অর্কেস্ট্রা
  • চলচ্চিত্র সঙ্গীত
  • জ্যাজ
  • পপ ও ব্যালাড
  • এমনকি ইলেকট্রনিক সঙ্গীতেও

চলচ্চিত্রে আবেগী দৃশ্যে ভাসমান বেহালা বা স্যাক্সোফোন প্রায়ই অবলিগাতোর ভূমিকা পালন করে।

অবলিগাতো সুরের বৈশিষ্ট্য

একটি অবলিগাতো অংশে সাধারণত থাকে—

  • স্বতন্ত্র সুররেখা

  • গঠনগত অপরিহার্যতা

  • আবেগ প্রকাশের নির্দিষ্ট ভূমিকা

  • মূল সুরের সঙ্গে স্বাধীন ছন্দগত চলন

  • নির্দিষ্ট যন্ত্রের ক্ষমতা অনুযায়ী রচনা

 

পাশ্চাত্য সঙ্গীতে ‘অবলিগাতো’

 

কণ্ঠসঙ্গীতে অবলিগাতো

কণ্ঠসঙ্গীতে অবলিগাতোর ব্যবহার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

  • কণ্ঠ দেয় ভাষা ও প্রধান সুর
  • যন্ত্র যোগ করে আবেগের রং

যেমন—

  • বাঁশি → কোমলতা, আকুলতা
  • ওবো → বিষণ্ণতা, ভক্তি
  • বেহালা → তীব্র আবেগ, প্রেম

এভাবে একসঙ্গে বহুস্তরীয় অনুভূতি তৈরি হয়।

পরিবেশনের সময় করণীয়

অবলিগাতো বাজানো মানে কেবল ঠিক নোট বাজানো নয়।

  • ভারসাম্য: কণ্ঠ বা মূল সুর ঢেকে না যায়
  • ফ্রেজিং: একসঙ্গে শ্বাস নেওয়ার অনুভূতি
  • টোন ও রং: কণ্ঠসুলভ, গীতিময় স্বর
  • শোনা: পারস্পরিক শ্রবণ ও সংলাপ

 

কেন সুরকাররা অবলিগাতো ব্যবহার করেন?

  • আবেগ গভীর করতে
  • সুরের মধ্যে সংলাপ তৈরি করতে
  • যন্ত্রের রং ও বৈচিত্র্য আনতে
  • গঠন মজবুত করতে
  • প্রকাশভঙ্গি প্রসারিত করতে

 

শিক্ষামূলক গুরুত্ব

অবলিগাতো শেখা মানে—

  • ভালো করে শোনা শেখা
  • দলগত সঙ্গীতবোধ গড়ে তোলা
  • ভারসাম্য ও সংবেদনশীলতা অর্জন
  • সুরকারি চিন্তা বোঝা