হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে “ঠাট” হলো রাগ শ্রেণিবিন্যাসের মূল ভিত্তি। এর মাধ্যমে বিভিন্ন রাগকে স্বররচনা ও লয়ের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ঠাটের একটি স্বাভাবিক আবহ, কিছু নির্দিষ্ট স্বরসংযোজন ও অনুভূতির রং থাকে। এই ধারার মধ্যেই পূর্বী ঠাট এক অতি গম্ভীর, ভাবগভীর ও নাটকীয় আবহ বহনকারী স্বরপ্রকৃতি—যার মাধ্যমে সন্ধ্যার বিষণ্ণতা, আধ্যাত্মিকতা ও অন্তর্মুখী ভাব সংগীতে রূপ পায়।
Table of Contents
পূর্বী ঠাট (Poorvi Thaat) : হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক রহস্যময় সন্ধ্যার স্বরপ্রকৃতি
ঠাট ধারণার জনক
হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ঠাটভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের ধারণা প্রবর্তন করেন Vishnu Narayan Bhatkhande। তিনি সমগ্র রাগজগতকে ১০টি মৌলিক ঠাট-এ ভাগ করেন—যার মধ্যে পূর্বী ঠাট একটি।
পূর্বী ঠাটের স্বরবিন্যাস
পূর্বী ঠাটে ব্যবহৃত সাতটি স্বর হলো:
- সা (Sa) — শুদ্ধ
- রে (Re) — শুদ্ধ
- গা (Ga) — শুদ্ধ
- মা (Ma) — তীব্র (Tivra)
- পা (Pa) — শুদ্ধ
- ধা (Dha) — কোমল (Komal)
- নি (Ni) — শুদ্ধ
স্বরসূত্র:
Sa – Re – Ga – Ma♯ – Pa – Dha♭ – Ni – Sa
এই ঠাটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—একসাথে তীব্র মা ও কোমল ধা ব্যবহারের ফলে এক ধরনের তীব্র মানসিক উত্তেজনা, করুণতা ও আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য সৃষ্টি হয়।
গাওয়ার সময় (Time Theory)
পূর্বী ঠাটের রাগগুলো সাধারণত গাওয়া হয় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে। এই সময়ের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য—দিন থেকে রাত্রির সংক্রমণ, আলো-আঁধারের দ্বন্দ্ব—পূর্বী ঠাটের স্বরতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
পূর্বী ঠাটের রাগসমূহ
পূর্বী ঠাট থেকে জন্ম নেওয়া উল্লেখযোগ্য রাগগুলো হলো:
- রাগ পূরিয়া (Puriya)
- রাগ পূরিয়া ধনশ্রী (Puriya Dhanashree)
- রাগ মারওয়া (Marwa)
- রাগ সোহিনী (Sohini)
- রাগ লক্ষ্মী
- রাগ গৌড় সারং (ভিন্ন পদ্ধতিতে গণ্য)
এই রাগগুলোতে গভীর আবেগ, আত্মসমর্পণ ও নাটকীয়তার ভাব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।
রাগ পূরিয়া ও মারওয়া: পূর্বী ঠাটের দুই স্তম্ভ
রাগ পূরিয়া
এটি পূর্বী ঠাটের সবচেয়ে পরিচিত রাগ। এতে আবেগময় ধ্যান, বিষণ্ণতা ও আত্মসমালোচনার অনুভূতি প্রবল।
রাগ মারওয়া
মারওয়া রাগে পা স্বর প্রায় বর্জিত থাকে বা ব্যবহার সীমিত থাকে। এর ফলে রাগ মারওয়া এক অশান্ত, টানটান আবহ তৈরি করে—যেন অন্তরে এক অদৃশ্য দ্বন্দ্ব চলছে।
গায়কী ও বাদ্যযন্ত্রে প্রয়োগ
পূর্বী ঠাট কেবল কণ্ঠসঙ্গীতেই নয়—সেতার, সরোদ, বাঁশি ও সারেঙ্গিতে অত্যন্ত সমাদৃত। কারণ এই ঠাটের রাগগুলোতে আলাপের বিস্তার ঘটানোর সুযোগ অনেক। ধীরে ধীরে স্বরতান বিস্তার করার মাধ্যমে শিল্পী আবেগের গভীর অন্তঃস্থলে পৌঁছাতে পারেন।
পূর্বী ঠাটের আবেগগত বৈশিষ্ট্য
এই ঠাট সাধারণত প্রকাশ করে:
- বিষণ্ণতা
- আধ্যাত্মিকতা
- গম্ভীর প্রেম
- সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা
- আত্মদর্শন
- ঈশ্বরের প্রতি আকুলতা
এই কারণে অনেক সুফি ভাবধারার সংগীতেও পূর্বী ঠাটের অনুরণন লক্ষ করা যায়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: পূর্বী বনাম মারওয়া ঠাট
যদিও মারওয়া রাগ পূর্বী ঠাটের অন্তর্গত, তবু মারওয়া ঠাট নামেও স্বতন্ত্র একটি ঠাট আছে। পার্থক্য হলো—মারওয়া ঠাটে রে থাকে কোমল কিন্তু পূর্বী ঠাটে রে থাকে শুদ্ধ। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বড় ধরনের ভাবগত পরিবর্তন ঘটায়।
আধুনিক সংগীতে প্রভাব
বর্তমানে ফিউশন মিউজিক, রবীন্দ্রসঙ্গীতের কিছু ধারা ও নজরুলগীতিতেও পূর্বী ঠাটের ছায়া দেখা যায়—বিশেষত বিষাদ, সন্ধ্যা ও আধ্যাত্মিক সাবজেক্টে রচিত গানে।

পূর্বী ঠাট কেবল একটি সংগীত-রীতি নয়—এটি এক সন্ধ্যার দর্শন। এতে যেমন সূর্যাস্তের বিষণ্ণতা, তেমনি আছে রাত্রির আগমনী বার্তা। যারা হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতে আত্মস্থ হওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের জন্য পূর্বী ঠাট এক গভীর অভিজ্ঞতার দরজা।
এ ঠাটের রাগে প্রবেশ মানে—শুধু স্বর শেখা নয়, বরং অন্তরে নেমে যাওয়া। পূর্বী ঠাট শেখায়—সঙ্গীত কথা না বলেও কেমন গভীর ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
