পেহেলগাম হামলার পর মোদিকে প্রশ্ন, ভারতীয় গায়িকার জামিন বাতিল

ভারতের জনপ্রিয় ভোজপুরি লোকসংগীত শিল্পী নেহা সিং রাঠৌর আবারও আইনি জটিলতার আবর্তে পড়েছেন। জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে বিতর্কিত প্রশ্ন তোলার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। গত ৬ ডিসেম্বর আদালত এই রায় প্রদান করেন, যার ফলে এই প্রতিবাদী গায়িকার যে কোনো মুহূর্তে গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিতর্কিত মন্তব্য

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর অতর্কিত হামলার পর দেশজুড়ে নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সেই সময় নেহা সিং রাঠৌর একটি ভিডিওর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, সরকার কেন নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের চেয়ে জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি ছিল তাঁর একটি উক্তি, যেখানে তিনি বলেছিলেন— “সরকারের কাছে আমি কেন প্রশ্ন করব না? আমি কি সরকারের বদলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রশ্ন করব? এই দেশ এখন ধর্ম ও জাতির ভিত্তিতে চলছে।” তাঁর এই শ্লেষাত্মক মন্তব্য ও সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে করা প্রশ্নগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

আইনি জটিলতা ও আদালতের অবস্থান

নেহা সিং রাঠৌরের এই মন্তব্যের পর উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা (FIR) দায়ের করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, নেহার মন্তব্য ধর্মীয় উসকানি এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার সামিল। আইনি প্রতিকার পেতে নেহা এলাহাবাদ হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছিলেন।

[চিত্র: ভারতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আগাম জামিন সংক্রান্ত নির্দেশিকা]

তবে বিচারপতিরা তাঁর আবেদনটি বিবেচনা করে খারিজ করে দেন। আদালত মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে লক্ষ্য করে করা তাঁর মন্তব্যগুলো সরাসরি দায়বদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, যা তদন্তাধীন অবস্থায় জামিন পাওয়ার যোগ্য নয়। আদালত আপাতত জামিন না দিয়ে আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

নেহা সিং রাঠৌরের আইনি লড়াইয়ের সংক্ষিপ্তসার

নিচে নেহা সিং রাঠৌরের বর্তমান পরিস্থিতির একটি সারণি প্রদান করা হলো:

বিষয়বিবরণ
মূল অভিযোগপেহেলগাম হামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
বিতর্কিত অনুষঙ্গধর্মীয় মেরুকরণ এবং জিন্নাহর সাথে তুলনা করে সমালোচনা।
মামলার স্থানলখনউ ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলা।
আইনি পদক্ষেপএলাহাবাদ হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন।
আদালতের রায়৬ ডিসেম্বর আগাম জামিনের আবেদন নাকচ।
বর্তমান অবস্থাগ্রেফতারের ঝুঁকি ও নিয়মিত আইনি শুনানির অপেক্ষা।

 

নেহার প্রতিরক্ষা ও বাকস্বাধীনতা

নিজের মন্তব্যের স্বপক্ষে নেহা সিং রাঠৌর বরাবরই অনড়। তিনি দাবি করেছেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে সরকারের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। তিনি কোনো উসকানিমূলক গান বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো কাজ করেননি। তাঁর মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো যখন ঢাকা পড়ে যায়, তখন একজন শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সরব হয়েছেন।

নেহা সিং রাঠৌর এর আগেও ‘ইউপি মে কা বা’ (UP Mein Ka Ba) গানের মাধ্যমে উত্তরপ্রদেশ সরকারের সমালোচনা করে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। এবারের ঘটনাটি তাঁর সেই প্রতিবাদী ইমেজে নতুন মাত্রা যোগ করল। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলাটি ভারতের সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সমালোচনার সীমানা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।