ভারতীয় উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গসংগীতে যেমন গ্বালিয়র, কিরানা, আগ্রা বা পাটিয়ালা ঘরানার ঐতিহ্য সুপ্রতিষ্ঠিত, তেমনই বাংলার সঙ্গীতমানচিত্রে কিছু ঘরানা নীরবে–নিভৃতে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচিতি নির্মাণ করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানা, যা বাংলার কণ্ঠসংগীত, সৃজনশীল তানকারি, লয়কারি এবং যন্ত্রসংগীত—বিশেষত বীণা ও সেতারের ক্ষেত্রে এক অনন্য অবস্থান সৃষ্টি করেছে।
এই ঘরানার জন্ম সংগীতের অন্যতম পীঠস্থান **বারানসি (কাশী)**তে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে। তৎকালীন প্রখ্যাত দুই সংগীতপ্রতিভা—হরিপ্রসাদ মিশ্র এবং মনোহর মিশ্র—এই ঘরানার প্রবর্তক। তাদের ব্যক্তিগত সংগীতপটুতা, নান্দনিক বোধ এবং অভিনব তান–লয়ের ব্যবহারের মাধ্যমেই “প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানা” জন্ম নেয়। দুই ভাইয়ের নামের প্রথম অংশ মিলিয়ে ঘরানাটির এমন মনোহর নামকরণ।
যদিও ঘরানার আদিগুরুদের অবস্থান ছিল বারানসিতে, প্রকৃতপক্ষে এর বিস্তার ও বিকাশ সবচেয়ে বেশি ঘটে কলকাতায়। হরিপ্রসাদ ও মনোহরের শিষ্য–প্রশিষ্যরা কলকাতায় এসে ঘরানাটিকে নতুন শিল্পমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা দেন। তখনকার বাঙালি উচ্চাঙ্গসংগীত–চর্চায় এই ঘরানা এক বিশেষ স্বরভঙ্গি ও কণ্ঠরীতির জন্ম দেয়, যা দ্রুত সমগ্র বাংলায় সমাদৃত হয়।

Table of Contents
প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানার শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য
এই ঘরানা শুধু তানকারি বা লয়কারির জন্য প্রসিদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ নান্দনিক বিদ্যালয়। এর গায়কি ও বাদনশৈলীতে—
✔ গভীর মনন
✔ শুদ্ধ লয়ের প্রতি অটল নিবেদন
✔ কণ্ঠের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
✔ স্বরের খোলা ও মাধুর্যমণ্ডিত পরিবেশন
✔ দ্রুত তালের নিখুঁত প্রয়োগ
✔ বোলতান ও সপাট তানের বিশিষ্টতা
ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ :
১. উচ্চাঙ্গ ও লঘু প্রকৃতির গীতের একত্র চর্চা
খেয়াল, ধ্রুপদ, বোলতান—সব ক্ষেত্রেই এই ঘরানা নিজের অবস্থান মজবুত করেছে।
২. লয়কারিতে অনন্য দক্ষতা
জটিল লয়, কঠিন মাত্রায় মসৃণ তান—এই ঘরানার শিল্পীর বিশেষ পরিচয়।
৩. বোলতানের নান্দনিকতা
খেয়ালে বোলতানের সূক্ষ্ম প্রয়োগ শ্রোতাকে অন্য অনুভূতির স্তরে নিয়ে যায়।
৪. খোলা আওয়াজ ও সুরের মাধুর্য
কণ্ঠে এক বিশেষ উজ্জ্বলতা ও স্বচ্ছতা, যা ঘরানার শিল্পীদের সহজেই আলাদা করে চেনায়।
৫. যন্ত্রসংগীতে জোরদার বোলের ব্যবহার
বিশেষত বীণা ও সেতারে বোল ও মীন্ডের বলিষ্ঠ প্রয়োগ এই ঘরানাকে আলাদা পরিচয় দেয়।

প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানার বিস্তার : কলকাতা থেকে সমগ্র বাংলায়
উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণ ছিল বাংলায় সংগীতজাগরণের এক স্বর্ণযুগ। এই সময়ে প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানার শিল্পীরা কলকাতাকে কেন্দ্র করে বহু শিক্ষার্থী গড়ে তোলেন। ফলে ঘরানাটি ধীরে ধীরে—
- বর্ধমান,
- নদিয়া,
- কুষ্টিয়া,
- রাজশাহী,
- ময়মনসিংহ,
- ঢাকা
সহ সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘরানার শিল্পীরা তৎকালীন জমিদারবাড়ির সম্মেলন, সভা–সমিতি এবং সংগীতআড্ডায় নিয়মিত অংশ নিতেন। ফলে বাংলা গানের পরিমণ্ডলে উচ্চাঙ্গসংগীতের একটা স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পী
লক্ষ্মীপ্রসাদ মিসির (১৮৬০–১৯২৯)
এই ঘরানার অন্যতম সেরা প্রতিনিধি। তার জীবনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক— তিনি ছিলেন বারানসির বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ রামকুমার মিসিরের পুত্র। পিতার কাছেই খেয়াল, ধ্রুপদ ও বীণার কঠোর তালিম নেন। পরিণত বয়সে একজন অসাধারণ বীণাবাদক হিসেবে খ্যাতি পান। জৌনপুর মহারাজের কাছ থেকে বহু স্বর্ণপদক অর্জন করেন। পূর্ণিয়ার রাজা নিত্যানন্দ সিংহকে সেতার শেখান। কলকাতায় স্যার আশুতোষ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত সংগীত সংঘে অধ্যাপক ছিলেন। বারানসি অঞ্চলে তিনি “কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতের বিদ্বান” হিসেবে সুপরিচিত। পরবর্তীতে রাজা বীরেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে গৌরীপুরে আসেন এবং স্থানীয় সংগীতচর্চায় নতুন প্রাণসঞ্চার করেন।
এছাড়া শিল্পী মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, নৃপেন্দ্রকুমার মিশ্রসহ আরও বহু কণ্ঠশিল্পী এই ঘরানার দৃষ্টান্তমূলক প্রতিনিধি।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও মূল্যায়ন
প্রসদ্দু–মনোহর ঘরানা শুধু একটি কণ্ঠশৈলী নয়, বরং এটি বাংলার সংগীতঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। এর—
- তানকারির অনন্য রীতি
- খোলা আওয়াজের বিশেষত্ব
- যন্ত্রসংগীতের দৃঢ়তা
- বোলতানের সৃষ্টিশীলতা
আজও সংগীতশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
বাংলার উচ্চাঙ্গসংগীত–ঐতিহ্যকে যারা অনুসরণ করেন, তারা আজও এই ঘরানার শিল্পীদের কাজ থেকে শিখে থাকেন। অবশ্য আধুনিক যুগে ঘরানার সরাসরি ধারক–বাহক সংখ্যা কমে গেলেও এর শৈল্পিক প্রভাব সংগীতের গভীরে রয়ে গেছে।
