ফতুল্লায় সংগীতশিল্পী সুমন খলিফার মর্মান্তিক মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সংগীতশিল্পী সুমন খলিফাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকাজুড়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; বরং এটি সংগীতজগতের নিরাপত্তা, স্থানীয় অপরাধচক্রের প্রভাব, অন্ধকারাচ্ছন্ন সামাজিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঝুঁকির প্রশ্নকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

৩২ বছর বয়সী সুমন খলিফা দীর্ঘদিন ধরেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। স্ত্রী সোনিয়া আক্তারের সঙ্গে তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতেন। রোববার রাতে পঞ্চবটি এলাকার এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। অনুষ্ঠান চলাকালে তিনি মঞ্চ থেকে বাইরে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি—এই বিষয়টি সন্দেহের বীজ বপন করেছে।

পরদিন সকালে মধ্য নরসিংপুর এলাকায় একটি পরিত্যক্ত বাড়ির পাশে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিকবার আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ধরন দেখে এটি যে নৃশংস ও পূর্বপরিকল্পিত, তা স্পষ্ট।

নিহতের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার বলেন, “এটি আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। কারও সঙ্গে তার বড় ধরনের কোনো শত্রুতা ছিল বলে আমাদের জানা নেই।” তার কথায় অসহায়তা ও অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি আরও জানান, সুমনের ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়, যা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।

পুলিশ বলছে, ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিনুজ্জামান জানান, “এটি সাধারণ কোনো অপরাধ বলে মনে হয় না। হত্যাকারীরা ঘটনাস্থল বেছে নিয়েছে এমন জায়গায়, যেখানে রাতের অন্ধকারে কাউকে হত্যা করে সহজেই পালিয়ে যাওয়া যায়।” তিনি জানান, মোবাইল ফোনের ডেটা, অনুষ্ঠানস্থলের সিসিটিভি এবং আশপাশের এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফতুল্লা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অপরাধচক্র সক্রিয়। চাঁদাবাজি, মাদককারবার, স্থানীয় আধিপত্য—এসব কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষও অপরাধের জালে পড়ে যায়। সুমনের হত্যায় এসব অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।

অনেকে মনে করছেন, যেহেতু সুমন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি, পূর্বের কোনো বিরোধ, অথবা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত কোনো বিবাদই তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আবার কেউ কেউ ধারণা করছেন, এটি সরাসরি ছিনতাই বা তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের ঘটনা নয়—বরং লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহশিল্পী ও ভক্তরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অনেকেই বলছেন, “রাতের অনুষ্ঠান শেষ করে ফেরার সময় শিল্পীরা নিরাপদ নয়।” এ দাবি যে ভিত্তিহীন নয়, তা বিভিন্ন সময়ের ঘটনাই প্রমাণ করে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জোরালোভাবে উঠছে।

পুলিশ বলছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

সুমন খলিফার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি সমাজের অন্ধকার দিকের প্রতিফলন—যেখানে শিল্পীরা পর্যন্ত নিরাপদ নন। পরিবার, সহকর্মী ও এলাকার মানুষ হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।