ফরিদপুরের মাটির কন্যা, মুম্বাইয়ের কিংবদন্তি—গীতা দত্ত

তিনি যেন জন্মেছিলেন গান হওয়ার জন্য। যখন ‘তুমি যে আমার’ শুনি, মনে হয় সুচিত্রা সেন নিজেই যেন হৃদয় ভেঙে গান করছেন! অথচ সেই অমর গানের পেছনে যে কণ্ঠ, তিনি ফরিদপুরের এক কিশোরী—গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী, পরবর্তী সময়ে গীতা দত্ত।

১৯৩০ সালের শীতের আগমনী দিনে জন্ম তাঁর। সুরের প্রতিভা এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে মা-বাবা ছোটবেলাতেই বুঝে ফেলেছিলেন—গীতার ভাগ্য সংগীতেই লেখা। গুরু হরেন্দ্রনাথ নন্দীর কাছে শুরু হয় তালিম। পরে দেশভাগের টানাপোড়েন, জমিদারি হারানো, আর্থিক সংকট—এসবের ভিড়ে পরিবার গিয়ে থামে মুম্বাইয়ে। সংগীত শেখার সুযোগ নেই, নেই আর্থিক অবকাশ—তবুও গানের অনুশীলন থামেনি কখনো।

যে মেয়েটি টিউশনি করে বেড়াতেন, সেই মেয়ের কণ্ঠ একদিন শুনে ফেললেন পণ্ডিত হনুমান প্রসাদ। আর সেখানেই শুরু চলচ্চিত্রসঙ্গীতে তাঁর উত্থান। ১৯৪৬ সালে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’-এ কোরাস গেয়ে পরের তিন বছরেই ভারতের শীর্ষ তিন কণ্ঠশিল্পীর একজন হয়ে ওঠেন তিনি। ‘দো ভাই’-এর গভীর বেদনার গান তাঁকে রাতারাতি প্রতিভাধর শিল্পীর মর্যাদা এনে দেয়।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বুঝেছিলেন—‘তুমি যে আমার’ কেবল গীতাই গাইতে পারবেন। এবং সেই সত্য আজও অটুট।

কর্মজীবনের চেয়েও নাটকীয় ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবন। প্রেম, বিয়ে, এবং পরে হৃদয়ভাঙা—সবই যেন এক সিনেমার গল্প। গুরু দত্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ছিল যেমন রূপকথা, বিচ্ছেদ ছিল তেমন দগ্ধ করা বাস্তবতা। ওয়াহিদা রহমানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্পর্কের জটিলতা, চলচ্চিত্রজগতে প্রতিযোগিতা, লতা–আশার আধিপত্য—সব মিলিয়ে গীতা হারাতে থাকেন নিজেকে।

গুরু দত্তের আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দেয় পুরোপুরি। মদ্যপান, রোগ, আর্থিক সংকট—এর মধ্যে দাঁড়িয়ে আবার ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ‘অনুভব’-এর গানগুলো দিয়ে যেন দেখাতে চেয়েছিলেন—তিনি আজও একই গীতা। কিন্তু শরীর আর সায় দেয়নি। সিরোসিসের যন্ত্রণা তাঁকে সীমাহীন কষ্ট দিয়ে অবশেষে নিয়েছে ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই।

তবুও গীতার গান হারায়নি। তাঁর কণ্ঠে যে আবেগ, তা আজও আধুনিকতার সীমা ভেঙে অমর হয়ে আছে। কারণ, সত্যিই—লতা–আশা হওয়া যায়, কিন্তু গীতা হওয়া যায় না।