বাঁশের বাঁশির ঈশ্বর পান্নালাল ঘোষ কে নিয়ে যা বললেন কবীর সুমন

বাঁশের বাঁশির ঈশ্বর পান্নালাল ঘোষ কে নিয়ে কবীর সুমন আক্ষেপ করে তার ফেসবুকে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন:

বাঁশের বাঁশির ঈশ্বর পান্নালাল ঘোষের নামে রাস্তা – মুম্বই এর একটি পাড়ায়।
পশ্চিমবঙ্গে?

 

বাংলাদেশ তাঁর জন্মশতবর্ষ উদযাপন করেছিল তিনদিন ধরে। পশ্চিমবঙ্গ? এখানকার নামী ক্লাসিকাল পণ্ডিত বিদূষীরা আমন্ত্রিত হয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন গাইতে বাজাতে। নিজেদের দেশে?

আমি সে সময়ে সাংসদ ছিলাম। জন্মশতবর্ষের মাস তিনেক আগে থেকে আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও লোকসভার স্পিকারকে একাধিক চিঠি দিয়ে আবেদন করেছিলাম – পান্নালাল – ঘোষের শতবর্ষ পালন করা হোক। যেমন, কিছু না হোক একটা বিশেষ ডাকটিকিট বের করে। একটি চিঠিরও উত্তর দেননি কেউ। অথচ আমার লিখিত আবেদন দিল্লির সংসদ ভবনে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গিয়েছিল আমার দিল্লি সেক্রেটারি মারফৎ – সরাসরি। সেই চিঠি প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের দপ্তরে পৌঁছোয়নি তা হতে পারে না।

[ বাঁশের বাঁশির ঈশ্বর পান্নালাল ঘোষ কে নিয়ে যা বললেন কবীর সুমন ]

পশ্চিমবঙ্গের গুণী, নামাগ্রে পণ্ডিতওস্তাদবিদূষী ব্যবহার করা ক্লাসিকাল শিল্পীরা পান্নালাল ঘোষের নামের আগেও “পণ্ডিত” বসান। তাঁর নামের আগেও পণ্ডিত, আবার শ্রীযুক্ত হিমসিম হলধরের নামের আগেও। কারুর কারুর আগে আবার “আচার্য”।
বেশ।

কিন্তু পান্নালাল ঘোষের তৈরি কটি রাগে এই রাজ্যে কেউ কোনও বন্দিশ বা গান বানিয়েছেন। জীবিত কন্ঠশিল্পীদের মধ্যে কজন সেই বন্দিশ খেয়াল আঙ্গিকে গেয়েছেন? এস্রাজের প্রফেট রণধীর রায় ছাড়া বাংলার আর কোন্ যন্ত্রশিল্পী পান্নালালের তৈরি একটি রাগও বাজিয়েছেন কখনও। —

বাংলাদেশে?

পান্নালাল ঘোষ মুম্বই এর পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন এখানে থেকে কাজ করবেন বলে। সেযুগের নেতৃস্থানীয় কলকাতাইয়া যন্ত্রীদের কেউ কেউ তাঁকে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকতে দেননি। পান্নালাল চরম দারিদ্রে দিন কাটাচ্ছিলেন সপরিবারে। সেই খবর পেয়ে সেসময়কার কেন্দ্রীয় বেতার তথ্যমন্ত্রী বি ভি কেশকার নিজে কলকাতায় এসে বাঁশের বাঁশির ঈশ্বরকে দিল্লি নিয়ে যান। শুনেছি আকাশবাণী দিল্লি কেন্দ্রে তাঁর প্রযোজকের চাকরি পাবার ব্যবস্থা করে দেন। শুধু তাই নয়। জাতীয় বাদ্যবৃন্দ তৈরি করে তার কন্ডাকটর পদেও পান্নালালকে বহাল করেছিলেন বি ভি কেশকার।

আমার বন্ধু শর্বরী দাস তাঁর ছবি ল্যামিনেট করে উপহার দিয়েছেন আমায়। শর্বরী, তুমিই পারো।

আমি, নাপণ্ডিতনাওস্তাদ গড়িয়াহাটারমোড়ওয়ালা কোবরে সুমন পান্নালাল সৃষ্ট নূপুরধ্বনি ও দীপাবলী রাগে বাংলায় খেয়াল বন্দিশ রচনা করে, গেয়ে ইন্টারনেটে দিয়েছিলাম। সেগুলি শুনে পান্নালালভক্ত এক ভারতীয় বিজ্ঞানী, ডক্টর বিশোয়াশ কুলকার্নি, যিনি পান্নাবাবুর ঘরাণায় বাঁশিও শিখেছেন, যোগাযোগ করেন।

আমার বিশিষ্ট বন্ধু শর্বরী দাস, মোটেও সঙ্গীতশিল্পী নন, আর ডক্টর কুলকার্নি একজোট হয়ে আই সি সি আর এর সাহায্যে মুম্বই শহরে বাঁশির ঈশ্বরের শতবর্ষ পালন করেছিলেন। নেহাত শর্বরী আর ডক্টর কুলকার্নি ছিলেন তাই আম্মোও আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। গিটার বাজিয়ে আমি পান্নাসৃষ্ট নূপুরধ্বনি রাগে বাংলা ভাষায় একটি খেয়াল বন্দিশ গেয়েছিলাম “গান” হিসেবে। এখানকার গুণী ক্লাসিকাল শিল্পীরা সে খবর রাখতে যাবেন কেন। আমার স্বভাবচরিত্র “খারাপ” বলে যে মহান সহনাগরিকরা ফেসবুকে আমায় গাল দিয়ে সুখ পান তাঁরাও রাখেন না রাখবেন না সেই খবর।

আমি গর্বিত যে আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে এ রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা খেয়ালের যে দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাক্রম রাজ্য সঙ্গীত একাডেমিতে চালু করায় সাহায্য করেছিলেন তার শিক্ষার্থীদের আমি পান্নালালসৃষ্ট নূপুরধ্বনি রাগে বাংলা ভাষায় একটি খেয়াল বন্দিশ শেখাতে পেরেছি ছোট খেয়াল সমেত। সে সময়ে সুরসম্রাজ্ঞী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছিলেন একাডেমির সভাপতি। তিনি বাংলা ভাষায় খেয়ালের পক্ষে ছিলেন। আজ তিনি নেই। বুঝতে পারি আমার সময়ও শেষ হয়ে আসছে।

আমার গর্ব, আমার প্রথম গানগুরু সুধীন্দ্রনাথ ও আমার খেয়ালগুরু (উপাধিহীন) কালিপদ দাসের কৃপায় আমি পান্নালাল ঘোষের তৈরি নূপুরধ্বনি, কুমারী, দীপাবলী, চন্দ্রমৌলী, শুক্লাপলাশী রাগগুলিতে পূর্ণাঙ্গ খেয়াল বন্দিশ রচনা করেছি, একাধিক রাগ গেয়েওছি।

আমার সময় সীমিত। আমি জানি যে জাতি ভীষ্মদেব জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদের অবদান মনে রাখে না সে জাতি আমার মতো কারুর কাজও মনে রাখবে না। সেটা আমার চিন্তা নয়। আর বাঁচার বিশেষ ইচ্ছেও নেই। যা করার ছিল করেছি।
ভাল লাগছে ভাবতে আমার দেশ ভারতের মুম্বই শহরে পান্নালাল ঘোষের নামে একটা রাস্তা হয়েছে। উনি ঐ অঞ্চলে থাকতেন – মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতেন যখন।
♠♠♠♠♠
২৮ মার্চ ২২

Leave a Comment